বই হাতে স্বপ্নবাজ কিশোর ছড়াচ্ছে জ্ঞানের আলো

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  কলিহাসান, দুর্গাপুর (নেত্রকোনা)

একটি গ্রামের গল্প বদলে দিতে কখনো বড় কোনো প্রতিষ্ঠান লাগে না, প্রয়োজন হয় একজন স্বপ্নবান মানুষের। যে বিশ্বাস করে একটি বই শুধু পড়ার বস্তু নয়, বরং মানুষের চিন্তা, মনন ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শালুয়াকান্দা গ্রামের কিশোর মেহেদি হাসান ফাহিম তেমনই এক স্বপ্নসন্ধানী। বাবা জলিল ও মা মোছা. আয়েশার তিন সন্তানের মধ্যে ফাহিম একজন। দুই ভাই ও এক বোনের সংসারে বেড়ে ওঠা এই কিশোর বর্তমানে গুজিরকোণা উচ্চ বিদ্যালয়-এর নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। বয়সে ছোট হলেও তার ভাবনার পরিধি বিস্তৃত। শৈশব থেকেই বই ছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। বইয়ের পাতায় তিনি খুঁজে পেয়েছেন জ্ঞান, কল্পনা, মানবিকতা আর নতুন পৃথিবীর সন্ধান।

সেই ভালোবাসা থেকেই ২০২৪ সালে মাত্র ২০টি বই নিয়ে নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘লাল মিয়া স্মৃতি পাঠাগার’। প্রিয় দাদা লাল মিয়ার স্মৃতিকে ধারণ করে গড়ে ওঠা এই পাঠাগার ছিল একটি স্বপ্নের বীজ। সময়ের সঙ্গে সেই বীজ আজ সবল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে পাঠাগারে রয়েছে ৬৫০-এরও বেশি বই এবং প্রায় ১০০ জন নিবন্ধিত পাঠক। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এখানে এসে বইয়ের পাতায় ডুবে যান, নতুন কিছু জানেন, নতুন করে ভাবতে শেখেন।

এই পাঠাগারের বিশেষত্ব শুধু বইয়ের সংগ্রহে নয়, এর মানবিক দর্শনেও। গ্রামের যাঁরা পাঠাগারে এসে বই নিতে পারেন না, তাঁদের জন্য বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পাঠাগারের একজন সদস্য নিয়মিত পাঠকদের হাতে বই পৌঁছে দেন এবং নির্ধারিত সময়ে তা সংগ্রহ করে আনেন। ফলে বই পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের দোরগোড়ায়।

শুধু জ্ঞান নয়, স্বাস্থ্যসচেতনতাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন ফাহিম। পাঠাগারে বিনামূল্যে রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ওজন মাপার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বই পড়তে এসে অনেকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিচ্ছেন। একটি ছোট্ট পাঠাগার এভাবেই হয়ে উঠেছে শিক্ষা ও মানবিক সেবার মিলনকেন্দ্র। ফাহিমের স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই। তিনি বড় হয়ে একজন দক্ষ ও মানবিক চিকিৎসক হতে চান। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায়দের সেবা করা এবং সমাজে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করা- এই তিনটি লক্ষ্যই তার জীবনের পথচলার প্রেরণা। আজকের সময়ে, যখন স্মার্টফোনের পর্দা অনেক শিশুর হাতে বইয়ের জায়গা দখল করে নিচ্ছে, তখন শালুয়াকান্দার এই কিশোর নিঃশব্দে এক ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। সে দেখিয়ে দিচ্ছে, একটি পাঠাগার কেবল বই রাখার স্থান নয়; এটি স্বপ্ন লালনের ঠিকানা, মূল্যবোধ গঠনের বিদ্যালয় এবং সমাজ পরিবর্তনের সূতিকাগার।

মেহেদি হাসান ফাহিম জানান, এটি কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়; এটি এক গ্রামের জেগে ওঠার গল্প, বইকে ভালোবাসার গল্প এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করার গল্প। অনেক স্বপ্নবান তরুণের হাত ধরেই হয়তো একদিন গড়ে উঠবে জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও আলোকিত বাংলাদেশ।

ইউসুফ তালুকদার সাগর জানান, মেহেদি হাসান ফাহিমণ্ডএর মতো মেধাবী ও স্বপ্নবান ছেলে আমাদের সমাজে বিরল। তার অদম্য স্পৃহা ও প্রগতিশীল চিন্তাধারা অল্প বয়সেই যে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে, তা আমাদের জন্য গর্বের। বাকলজোড়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাঠাগারের উন্নয়নে নিরন্তর পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।