দুদকের মামলায় সাবেক সাব রেজিস্ট্রার কারাগারে
প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ফরিদপুর প্রতিনিধি
সরকারি দলিলের মূল নথি (বালাম) থেকে ফ্লুইড ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে জমির মালিকানা পরিবর্তনের চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইউসুফ আলী মিয়াকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল রোববার ফরিদপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে বিচারক সেলিম রেজা আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালত সূত্র জানায়, দুদকের দায়ের করা মামলায় হাজির হয়ে ইউসুফ আলী মিয়া জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলাটির তদন্ত এখনও চলমান।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৫ মে ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত একটি হেবা ঘোষণাপত্র (দলিল নম্বর-৪০৬৭) জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলী মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা যোগসাজশে দলিলের মূল বালামের ষষ্ঠ পৃষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফ্লুইড দিয়ে মুছে ও ঘষামাজা করে দলিলের প্রকৃত তথ্য পরিবর্তন করেন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, স্ট্যাম্প নম্বর ০৩১৭১৯৭-এর শেষ লাইনের পর থাকা ‘যাহা দিয়ারা ৩৯১৯ ও ৩৯২০ নং দাগ হইতে দখলভোগ করিবেন’ এই বাক্যাংশ সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়। পরে পরিবর্তিত দলিলটি সরকারি বালামে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক স্বাক্ষরও সম্পন্ন করা হয়। এর ফলে দলিলের প্রকৃত গ্রহীতা ও অভিযোগকারী মো. খলিলুর রহমানকে প্রায় ৯ শতাংশ জমির দখল থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দুদকের অভিযোগ।
দুদক জানায়, অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান ও তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরদার আবুল বাসার বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলাটি দুদকের ফরিদপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা নম্বর-০২ এবং জি.আর-৬/২৬ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। মামলায় মোট পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন- সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. ইউসুফ আলী মিয়া, তুলনাকারক মো. মেহেদী হাসান, নকলকারক মনোয়ার হোসেন, পাঠক মো. জাহিদ শেখ এবং দলিলের দাতা মো. জিন্নাহ শেখ।
তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, জালিয়াতি, জাল দলিল ব্যবহার, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং অন্যায় সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদক জানিয়েছে, তদন্তে অন্য কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন হলে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ইউসুফ আলী মিয়া ২০১৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মকালেই তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ এবং প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় জমি নিবন্ধনে নানা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই সময়ে সরকারি বিধি উপেক্ষা করে অনেক দলিল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বাইরে ব্যক্তিগত বাসা, চেম্বার কিংবা অন্য স্থানে নিবন্ধনের অভিযোগ ছিল। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বা নানা কৌশলে নামমাত্র মূল্যে জমি হস্তান্তরে বাধ্য করার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ, তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক ব্যক্তির আশ্রয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন ফরিদপুরে ভূমি-সংক্রান্ত নানা কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করত। সেই চক্রের প্রভাবেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ আদালতে এখনো প্রমাণিত হয়নি।
২০২০ সালে ফরিদপুরে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ওই চক্রের কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর জাল দলিল, অবৈধভাবে জমি দখল এবং জোরপূর্বক দলিল নিবন্ধনের নানা তথ্য সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে সরকারি নথি জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের তদন্ত শুরু হয় এবং সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় বর্তমান মামলাটি দায়ের করা হয়। আইনজীবীরা বলছেন, সরকারি বালাম বা মূল দলিলের তথ্য পরিবর্তন করা শুধু জালিয়াতিই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নথির বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও আঘাত। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার নিশ্চিত হলে সরকারি ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কমতে পারে।
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে নতুন তথ্য বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলার পরবর্তী কার্যক্রম আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া হবে।
