টাঙ্গাইল মহাসড়কে রক্তের ছাপ ৬ মাসে নিহত ১৩০

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে থামছেই না মৃত্যুর মিছিল। মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও উত্তরবঙ্গের গাড়িচালকদের মাত্রাতিরিক্ত ওভারটেকিং প্রবণতা ও সার্ভিস লেন আটকে রাখায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। গত ছয় মাসে এ মহাসড়কে একের পর এক ভয়াবহ রোড সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে ১৩০টি তাজা প্রাণ। এই সময়ে ছোট-বড় মিলে ১০৮টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৮৩ জন। একই সময়ে রেল লাইনের টাঙ্গাইল অংশে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন ১৮ জন। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের মে মাসে মহাসড়কে দুর্ঘটনার তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি। মে মাসেই সর্বোচ্চ ৩৯ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত হন। এর মধ্যে গত ২৫ মে কালিহাতী উপজেলায় এক মর্মান্তিক অ্যাক্সিডেন্টে একটি ট্রাক উল্টে ঘটনাস্থলেই ১৫ জনের মৃত্যু হয়, যেখানে আহত হন ৯ জন। নিহতদের মধ্যে ৯ জনের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারসো ইউনিয়নে। এছাড়া জানুয়ারি মাসে ১২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৬ জন, মার্চে ২৩ জন, এপ্রিলে ২৪ জন এবং জুন মাসে ১৬ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। আহতদের মধ্যে জানুয়ারিতে ৯ জন, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ৭ জন করে, এপ্রিলে ১৮ জন এবং জুনে ৬ জন রয়েছেন।

অপরদিকে, মহাসড়কের পাশাপাশি অরক্ষিত রেলপথেও বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। গত ছয় মাসে টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মার্চে ৮ জন, এপ্রিলে ২ জন এবং মে মাসে ৫ জনের মৃত্যু হয়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, জুন মাসে ট্রেনে কাটা পড়ে কেউ মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। টাঙ্গাইলের ঘারিন্দা রেল পুলিশ স্টেশনের মুন্সি আবুল বাশার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, দুর্ঘটনা পরবর্তী সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মাধ্যমে টাঙ্গাইলের ট্রাস্টি বোর্ড থেকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। গত ছয় মাসে মোট ৫২ জন ক্ষতিগ্রস্ত বা তাদের পরিবারকে চেকের মাধ্যমে মোট ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান হস্তান্তর করা হয়েছে বলে বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে।

মোটরসাইকেল আরোহী আব্দুর রহিম, রাফসান জামিল, আরমান শেখ, সাইফুল্লাহ সহ অনেকেই জানান, যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়ক অত্যন্ত ঝুঁঁকিপূর্ণ। এটি দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা। এই মহাসড়কের যে অংশে সার্ভিস লেন আছে, সেখানে বিভিন্ন যানবাহন রেখে আটকে রাখা হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে মহাসড়কে উঠে যাচ্ছেন মোটরসাইকেল চালকরা। এছাড়া এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত এখনো কোনো সার্ভিস লেন নাই। মহাসড়কের দুই পাশে বালুর স্তূপ থাকায় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা প্রবল। দুই পাশের বালুর স্তূপ সরিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানান তারা।

টাঙ্গাইলের বাস কোচ মিনিবাস মালিক সমিতির আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম খান শফিক জানান, এই মহাসড়কে উত্তরাঞ্চলের যানবাহনের দুর্ঘটনার হার বেশি। দুর্ঘটনার জন্য উত্তরাঞ্চলের যানবাহনগুলোর বেপরোয়া গতিকে দায়ী করেন তিনি। তিনি অভিযোগ করেন, অদক্ষ চালক দিয়ে উত্তরাঞ্চলের যানবাহনগুলো পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহনের টাঙ্গাইলের সহকারী পরিচালক মাহতাব উদ্দিন আহমেদ জানান, যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে বিভিন্ন সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে প্রাণহানিও ঘটছে।সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পরিবহন মালিক-শ্রমিকসহ অংশীজনদের নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তারা সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করে থাকেন।

টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রবিউল ইসলাম পরামর্শ দেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য প্রথমত চালককে সচেতন থাকতে হবে। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো যাবেনা। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বাঁক রয়েছে। বাঁকগুলোতে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে দুর্ঘটনা ঘটবেই। সড়ক দুর্ঘটনার সম্ভাব্য প্রতিরোধে নিয়ম মেনে চললে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে। চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে গাড়ি চালাতে হবে। অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়ি চালানো যাবে না। পথচারীদের ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে।

তিনি জানান, সার্ভিস লেন থেকে মহাসড়কে উঠে অনেক মোটরসাইকেল চালকেরা গাড়ি চালাচ্ছেন। সেটা থেকে তাদেরকে বিরত থাকতে হবে এবং অতিরিক্ত গতি থেকে সরে আসতে হবে। এছাড়া দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হলো ওভারটেক করা। এ বিষযে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।