বন্যার পানিতে অবরুদ্ধ জীবন

ক্ষুধা আর বিশুদ্ধ পানির জন্য লড়াই

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এএইচ সেলিম উল্লাহ, কক্সবাজার

টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, নবগঠিত মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ। ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক, ফসলি জমি ও মাছের ঘের। পানিবন্দি ৩ লাখ মানুষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ সুপেয় পানি। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত তিন উপজেলার অন্তত ৫০টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা। এই দুই উপজেলার অন্তত ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অধিকাংশ এলাকায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

এদিকে বন্যার মধ্যে শুক্রবার সকালে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় পারাপারের সময় নৌকাডুবির ঘটনায় দুই বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন, হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) ও শাওরিন মনি (৭)। তারা স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেকের মেয়ে।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান বলেন, প্রবল স্রোতের কারণে নৌকাটি ডুবে যায়। দুই শিশুকে উদ্ধার করা হলেও শেষ পর্যন্ত ঝর্ণাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এর আগে বৃহস্পতিবার ভোরে চকরিয়ার বরইতলীর মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যায় চাচাতো ভাইবোন ওবাইদুল ইসলাম (১৪) ও রুমি আক্তার (১৭) নামে দুই শিশু কিশোর। এরপর দুপুরে কাকারা ইউনিয়নের আড়াই বছর বয়সি ওয়াকিম ও মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকার পুষ্প (৩) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। গত শুক্রবার নৌকাডুবিতে ঝর্ণা ও শাওরিনের মৃত্যুতে স্থানীয়ভাবে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়ে।

বানভাসি মানুষ জানান, হাজারো নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ পানির উৎস অচল হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারের ঘরে কোমর থেকে বুক সমান পানি থাকায় রান্নাবান্না বন্ধ করতে পারছেন না। প্রকট হয়ে উঠছে শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও ওষুধের সংকটও। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ মানুষ। চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়িতে কোমরসমান পানি। রান্না করার কোনো সুযোগ নেই। খাবার আর বিশুদ্ধ পানির জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে। চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মঈন উদ্দিন বলেন, ‘তিন দিন ধরে পানিবন্দি। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারও পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে যা সহায়তা দেয়া হচ্ছে খুবই অপ্রতুল।’

স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে অনেক এলাকায় পানি নামতে পারছে না। মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের জন্য।’

মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা মকবুল আহমদ বলেন, ‘বসতঘর ডুবে গেছে। চুলা জ্বলছে না। অসংখ্য মানুষ না খেয়ে আছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটও ভয়াবহ আকারে সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে তীব্র স্রোতে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় শতাধিক গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক পরিবার রাতারাতি ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।’ কোনাখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার বলেন, ‘উজানের ঢলে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে দুই উপজেলার দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।’ বন্যার পানিতে মাঠের পর মাঠ আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজি খেত ও শত শত মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। এতে স্থানীয় কৃষক ও মৎস্য চাষিরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে চকরিয়া-মহেশখালী সড়কসহ অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে থাকায় যান চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বান্দরবানের লামা ও আলীকদম থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা ১১ দশমিক ৮০ মিটার অতিক্রম করে ১১ দশমিক ৯৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি কমে গেলে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু হবে।’

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৩০ মেট্রিক টন চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।

অপরদিকে চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী ছাড়াও জমে থাকা বন্যার পানি এখন কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশও প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে; রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি, কাঠিরমাথা, পানেরছড়া ও চাইল্যাতলী এলাকায় মহাসড়কের ওপর দিয়ে দুই ফুটের বেশি পানি প্রবাহিত হওয়ায় ছোট যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ।

এ ছাড়া উখিয়া, কক্সবাজার সদর ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলপথ ও বিভিন্ন অবকাঠামোর কারণে অনেক এলাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হচ্ছে না।

জেলা প্রশাসন সুত্রে জানা যায়, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মজুত রয়েছে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ১০ লাখ টাকা এবং প্রায় দেড় হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট।

কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, ‘জেলার প্রায় ৯৬ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চলমান দুর্যোগে ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

নিহত স্থানীয় চার পরিবারের জন্য এক লাখ টাকা, আহত দুই পরিবারের জন্য ৩০ হাজার টাকা এবং ৫৫৫ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।’ জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাখা হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ত্রাণ বরাদ্দের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে।