বন্যপ্রাণীর চলাচল নিরাপত্তায় মধুপুর বনে পাঁচ রোপওয়ে করিডোর
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রঞ্জন কৃষ্ণ পন্ডিত, টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মধুপুর বনাঞ্চল অংশে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে পাঁচটি বিশেষ রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করেছে টাঙ্গাইল বন বিভাগ। পঁচিশ মাইল এলাকা থেকে রসুলপুর বাজার পর্যন্ত নির্মিত এসব করিডোরের মাধ্যমে সড়ক পারাপারের সময় যানবাহনের ধাক্কায় বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঘটনা কমিয়ে আনতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টাঙ্গাইল বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের আওতাধীন মহাসড়কের দুই পাশে পাঁচটি স্থানে সুউচ্চ গাছের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে দড়ি সংযুক্ত করে এসব রোপওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বানর, হনুমান, কাঠবিড়ালি, গন্ধগোকুল, খরগোষসহ বিভিন্ন বৃক্ষবাসী প্রাণী মাটিতে না নেমেই এক পাশ থেকে অন্য পাশে নিরাপদে চলাচল করতে পারবে।
মধুপুর বনাঞ্চল টাঙ্গাইলরে মধুপুর এবং ময়মনসিংহের ফুলবাড়য়িা ও মুক্তাগাছার প্রায় ৬২ হাজার একর জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এর মধ্যে ৪৫ হাজার একর বনভূমি ছিল মধুপুর উপজলোয়। নানা কারণে বনের বড় অংশ এখন উজাড় হয়েছে। জবরদখলকৃত ভূিমতে ক্রমশ বাড়ছে কলা-আনারসের রাজত্ব। তারপরও মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জ এবং দোখলা ও মধুপুর রেঞ্জে এখনও কিছু প্রাকৃতিক বন রয়েছে। এ বনে হরিণ, বাগডাস, মেছোবিড়াল, বানর-হনুমান, বনমুরগি ও গন্ধগোকুলসহ ছোটখাটো বন্যপ্রাণী এবং অনেক প্রজাতির পাখির দেখা মিলে। দীর্ঘদিন ধরে গজারি বন সাবাড় করে সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বনভূমিতে বিদেশী বৃক্ষে সামাজিক বা অংশীদারত্বের বনায়ন শালসহ হাজারো দেশীয় গাছপালা, গুল্মলতাদি এখন বিলীনের পথে। ফলে খাদ্যাভাব এবং আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় সব ধরনের বন্যপ্রাণী ও পাখি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। খাদ্যাভাবে বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। মধুপুর বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে মহাসড়ক নির্মাণের ফলে বন্যপ্রাণীর স্ব^াভাবিক বিচরণ ব্যাহত হয়েছে। খাদ্য সংগ্রহ কিংবা আবাসস্থল পরিবর্তনের সময় অনেক প্রাণী সড়ক পার হতে গিয়ে দ্রতগতির যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। নতুন এই রোপওয়ে করিডোর চালুর ফলে সেই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. মোশাররফ হোসেন জানান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে মধুপুর শালবন পুনর্প্রতিষ্ঠা প্রকল্পের আওতায় পঁচিশ মাইল থেকে রসুলপুর বাজার পর্যন্ত পাঁচটি রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বানর, হনুমান, সিভেটসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিরাপদে চলাচল করতে পারবে এবং যানবাহনের নিচে পিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি কমবে। তিনি জানান, প্রকল্পটি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. এএসএম সাইফুল্লাহ জানান, বনাঞ্চল সংলগ্নœ মহাসড়কে এ ধরনের বন্যপ্রাণীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমবে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলের জন্য রোপওয়ে করিডোর ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেখান থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহাম্মদ মহসীন জানান, টাঙ্গাইল-ময়মনসংিহ মহাসড়করে মধুপুর বনাঞ্চল অংশে সড়ক পাড়ি দিতে গিয়ে প্রায়ই বন্যপ্রাণীরা প্রাণ হারায়। এমতাবস্থায় বন বিভাগ জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের আওতাধীন মহাসড়করে উভয় পাশে পৃথক পাঁচ স্থানে পাঁচটি রোপওয়ে তৈরি করেছেন। সুউচ্চ গাছের সঙ্গে বিশেষ কায়দায় বাঁধা রোপওয়ে এখন করিডোর হিসেবে কাজ করছে। বন্যপ্রাণীদের যাতে গাছ থেকে নেমে হেঁটে বা লাফিয়ে সড়ক পাড়ি দিতে না হয়, সেই জন্যই এ করিডোর। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচটি রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে বনাঞ্চলের আরও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে একই ধরনের করিডোর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর আগে লাওয়াছড়া বনে নির্মিত রোপওয়ে করিডোর বানরকে ট্রেন চাপা থেকে রক্ষা করেছে। এ সফলতা বিবেচনা করে মধুপুর বনাঞ্চলে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
