আট বছরেও উদ্বোধন হয়নি কোটি টাকায় নির্মিত ইউনিয়ন ভবন

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এ.এইচ.এম.আরিফ, কুষ্টিয়া

৮ বছরেও উদ্বোধন হয়নি প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবনটি। তৎকালীন চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালী নেতার ব্যক্তিগত স্বার্থে জনবহুল এলাকা থেকে দূরে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ভবনটি নির্মাণ করায় তা এখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে রয়েছে। দাপ্তরিক কার্যক্রম না চলায় ভবনটি এখন মাদকসেবী ও বখাটেদের নিরাপদ আড্ডায় পরিণত হয়েছে। মূল্যবান সরকারি সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চুরি হয়ে যাচ্ছে ভবনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, খসে পড়ছে ছাদের পলেস্তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৯৭ লাখ ২৭ হাজার ১৩৮ টাকা ব্যয়ে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ করে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘বসুন্ধরা এন্টারপ্রাইজ’ কাজ সম্পন্ন করলেও বিতর্কের মুখে ভবনটি উদ্বোধনের আগেই তৎকালীন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল বারী টুটুল নির্বাচনে পরাজিত হন। এরপর থেকে ভবনটি আজও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও বাজার সংলগ্ন জনাকীর্ণ প্রধান এলাকা এড়িয়ে তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল বারী টুটুল নিজের প্রভাব খাটিয়ে এবং এলজিইডির কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে জনবসতি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নিজ গ্রামে জমি কিনে এই কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। জমি কেনা ও ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রভাবকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

পরবর্তীতে জাসদ সমর্থিত নির্বাচিত চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মিলন ভবনটির নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ দেখিয়ে এটি বুঝে নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে আজও তালা খোলেনি এই ভবনের। বর্তমানে জরাজীর্ণ পুরোনো ভবনেই ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সেবাগ্রহীতারা বলছেন, মূল এলাকা থেকে তিন মাইল দূরে নতুন ভবনের চেয়ে হাতের কাছের পুরাতন ভবনই তাদের জন্য সুবিধাজনক।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর ভবনটি ঘিরে বসে মাদকসেবীদের আসর। রাত বাড়লে এলাকাটি জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং ভীতিজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গরু-ছাগলের আশ্রায়ন আর বখাটেদের আড্ডায় পরিণত হওয়া এই ভবন এখন সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মিলন বলেন, ভূমি কেনা নিয়ে তখন বড় ধরনের বাণিজ্য হয়েছিল। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে এবং এলাকার মানুষকে ধোঁকা দিয়ে ভোটের উদ্দেশ্যে নিজ গ্রামে ভবনটি নেওয়া হয়েছিল। ভবনের নকশা ও অবকাঠামোতে অনেক ত্রুটি থাকায় এবং জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমি এটি গ্রহণ করিনি। এলাকার জনমানুষের সুবিধার কথা ভেবে পুরোনো ভবন সংস্কার করাটাই ছিল যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। আমবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সোহেল রানা লিটন বলেন, ‘বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা ও নিরাপত্তার অভাব থাকায় এখানে কার্যক্রম পরিচালনা করা কোনো চেয়ারম্যানের পক্ষেই সম্ভব হয়নি।

এবিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের মিরপুর উপজেলার সদ্য সাবেক প্রকৌশলী জহির মেহেদী হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘নিয়ম মেনেই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে।’ তবে ওই এলাকায় নিরাপত্তা সংকট যে রয়েছে, তা তিনি স্বীকার করেন। এত বছর ভবনটি কেন অকার্যকর পড়ে আছে এবং নির্মাণের সময় কেন নিরাপত্তা বা ত্রুটির বিষয়টি দেখা হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

কুষ্টিয়ার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক আহমেদ মাহবুব উল ইসলাম জানান, কোটি টাকার ভবনটি কেন ব্যাবহার করা হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

কোটি টাকার সরকারি সম্পদ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে বিনষ্ট হওয়ার পেছনে সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি ও প্রভাবশালী মহলের দায় দেখছেন আমবাড়ীয়া ইউনিয়নের প্রায় ১৩ হাজার সচেতন বাসিন্দা। তারা দ্রুত এই ভবনটিকে কার্যকর করার জন্য বা এর বিকল্প ব্যবহারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।