জলাবদ্ধতায় সীমাহীন ভোগান্তি
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে বৃষ্টির পানি আটকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার রূপ নিতে শুরু করেছে। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা এখন যেন স্থায়ী জলাবদ্ধতার নগরীতে পরিণত হয়েছে। একসময় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি মানেই ছিল সাময়িক ভোগান্তি। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। রূপগঞ্জে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়, বাড়ির আঙিনায় পানি ওঠে, বাজারে থমকে যায় বেচাকেনা, স্কুলগামী শিশুদের পথ হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হচ্ছে। কিন্তু জলাবদ্ধতার সেই একই রূপ। পানি যেন নামছেই না। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
প্রতি বর্ষায় একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। বছরের পর বছর উন্নয়ন প্রকল্প, ড্রেন নির্মাণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনের নানা প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে দুর্ভোগ কমেনি- বরং বেড়েছে জনঅসন্তোষ।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, তারাবো, কাঞ্চন, ভুলতা, গোলাকান্দাইল ও মুড়াপাড়াসহ বিভিন্ন পৌরসভা এবং ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকায় কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেক বাড়ির নিচতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ায় চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। রান্নাঘর, শোবার ঘর ও উঠানে পানি ঢুকে পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও বয়স্কদের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে বের হলেও গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা ভরাট, দখল এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবের কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হচ্ছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা শোনা গেলেও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং নতুন সড়ক ও ভবন নির্মাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় পানি নিষ্কাশনের সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জলাবদ্ধতা এখন শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই বর্ষা শেষে নয়, বর্ষা শুরুর আগেই কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার দাবী তাদের। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের মানুষ। পানি জমে থাকায় অনেকেই কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরশনে বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন সংস্কার, খাল পরিষ্কার এবং পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় কিছু নতুন প্রকল্পও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে দ্রুত নগরায়ণ, অতিবৃষ্টি এবং সীমিত অবকাঠামোর কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
কর্ণগোপ এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার বলেন, বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা হয় বাড়ি ঘরে পানি উঠে যায়। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও পানি নামছে না। ছোট শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
শান্তিনগর এলাকার গৃহিণী সাহিদা আক্তার বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে বেশ কিছুদিন ধরে বাড়ির উঠানে ঘরে পানি জমে আছে। রান্নাঘরেও পানি।
উন্নয়নের কত কথা শুনি কিন্তু বর্ষা এলেই বোঝা যায় বাস্তবতা কী। বৃষ্টি এলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। আমাদের কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই। গোলাকান্দাইল এলাকার বাসিন্দা মজিবর মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ড্রেন আছে নামকাহস্তে। দখল দুষণে খালের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। পানি যাওয়ার পথ নেই। তাইতো জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে। প্রতিবছর একই সমস্যা হলেও কেউ স্থায়ী সমাধান করছে না। উন্নয়নের বাণী শুনি কাজের কাজ কিছুই না।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আকতার হোসেন বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন খালগুলো দখল ও দূষণে পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। আমরা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছি।
এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, এ উপজেলায় প্রায় ৭০০ ফ্যাক্টরি রয়েছে। এখানে কিছু ফ্যাক্টরি ও বাসা বাড়ি একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। এ কারণে অনেকাংশে খাল এবং ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় সেচ পাম্প বসানোর মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনে উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে।
