অনিশ্চয়তায় দেশের প্রথম বেসরকারি সাপের খামার

কাঁচা বিষ কেনার ক্রেতা নেই

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এম কে রানা, পটুয়াখালী

প্রতিবছর বাংলাদেশে বিষধর সাপের কামড়ে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়। অথচ সাপের কামড়ের চিকিৎসায় দেশের হাসপাতালগুলো এখনও নির্ভরশীল বিদেশ থেকে আমদানি করা অ্যান্টিভেনমের ওপর। এতে প্রতি বছর ব্যয় হয় কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এই নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে পটুয়াখালীতে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী একটি সাপের বিষের খামার।

তবে দীর্ঘ ২৬ বছরের প্রচেষ্টার পর আইনিভাবে সাপের বিষ সংগ্রহের অনুমতি মিললেও উৎপাদিত বিষের কোনো ক্রেতা না থাকায় এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগ।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে ২০০০ সালে বাংলাদেশ স্নেক ভেনম নামে খামারটি প্রতিষ্ঠা করেন প্রবাসফেরত উদ্যোক্তা আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাস। সৌদি আরবে ক্যামেরাম্যান হিসেবে কর্মরত অবস্থায় তিনি প্রবাসী শ্রমিকদের কষ্ট ও কর্মসংস্থানের অভাব কাছ থেকে দেখেন। দেশে ফিরে এমন একটি উদ্যোগ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন, যা একদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে দেশের স্বাস্থ্য খাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, আমার বিশ্বাস ছিল, নিজের এলাকায় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা গেলে অনেকেই বিদেশে জীবিকার জন্য যেতে বাধ্য হবে না। সেই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ শুরু করি।

এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিষধর ও নির্বিষ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ সংগ্রহ করে খামার গড়ে তোলেন তিনি। বর্তমানে খামারটিতে ৩০০টিরও বেশি সাপ রয়েছে। এর মধ্যে কিং কোবরা, গোখরা, শঙ্খিনী, কালাচ, রাসেলস ভাইপার, পিট ভাইপার, অজগর ও দাড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ রয়েছে। প্রশিক্ষিত কর্মীরা বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করে এসব সাপ সংগ্রহ করছেন।

উদ্যোক্তা জানান, ২০০৮ সালে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে খামারের নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন তিনি। পরে ২০১৮ সালে পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদনও করেন। দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে প্রায় তিন মাস আগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন পান। এর ফলে এখন আইনিভাবে বিষধর সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।

এদিকে কাঁচা বিষ কিনতে কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাজি না হওয়ায় সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করতে পারছেন না তিনি। ফলে নিবন্ধন পাওয়ার পরও নতুন সংকট দেখা দিয়েছে খামারটিতে।

রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, সাপের কাঁচা বিষ সরাসরি বিক্রি করা যায় না। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তা পরিশোধন করে অ্যান্টিভেনম ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করতে হয়। এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ কোম্পানি কাঁচা বিষ সংগ্রহে আগ্রহ দেখায়নি।

তিনি জানান, কয়েকটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা জানিয়েছে, তারা শুধু পরিশোধিত (রিফাইন্ড) বিষ কিনে থাকে। এজন্য প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বিষ পরিশোধনের অনুমতি নিতে হবে। সেই অনুমতি পেলেই দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে বিষ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।

রাজ্জাক বিশ্বাসের দাবি, তার খামারে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের বিষ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য প্রায় আট কোটি টাকা। তিনি মনে করেন, এই বিষ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের পথ সুগম হবে এবং প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ শুধু একটি খামার হিসেবেই থাকবে না, এটি দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হতে পারে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে আর্থিক সংকট। তাই খামারটিতে ৮৬ জন কর্মকর্তা কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে চারজন কর্মী কাজ করছেন। শুরুতে কর্মী ছিলেন দুইজন। প্রতিদিন খামার পরিচালনায় প্রায় তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়। মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ টাকায়। কিন্তু উৎপাদিত বিষ বিক্রি করতে না পারায় কোনো আয় হচ্ছে না।

পটুয়াখালীর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, খামারটি সাপের বিষ সংগ্রহের নিবন্ধন পেয়েছে। তবে এই বিষ সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না। ওষুধ শিল্পে ব্যবহারের আগে অনুমোদিত মান বজায় রেখে এবং নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিষ পরিশোধন করতে হবে। প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ হলে পরবর্তী ধাপে বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। তবে রাজ্জাক বিশ্বাস এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।