উখিয়া ও টেকনাফে লাগানো হচ্ছে সাড়ে ২৭ লাখ গাছ

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এএইচ সেলিম উল্লাহ, কক্সবাজার

সরকারের ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে কক্সবাজার জেলায় ৪১,২০,৯৫০ টি চারা রোপণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের (ডিএফও’র) সার্বিক তত্ত্বাবধানে চলতি মৌসুমে টেকনাফ ও উখিয়ায় ২৭লাখ ৫৬হাজার ১শ টি বৃক্ষ রোপন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দ্বারা বন, বনভুমি এবং বন্যপ্রাণীর যে অপুরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তা পুনরুদ্ধারে প্রকল্পটি সহায়ক ভুমিকা রাখতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার উখিয়ার ইনানী রেঞ্জে রোপিত বনায়ন এলাকা পরিদর্শন করে আবিভূত হয়েছেন সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। এসময় উপস্থিত ছিলেন উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সোলতান মাহমুদ চৌধুরী, সহকারী বন সংরক্ষক, টেকনাফ ও উখিয়া দায়িত্বরত ( এসিএফ) মো. মনিরুল ইসলাম, ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাফিউল ইসলাম ও জালিয়াপালং ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক শাহ আমীন চৌধুরীসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। বনবিভাগ সুত্র জানায়, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটে ২০ হেক্টরে ৫০হাজার, হ্নীলা বিটে ৬০ হেক্টরে ১লাখ ৫০হাজার ও মধ্য হ্নীলা বিটে ১শ হেক্টরে ২লাখ ৫০হাজার গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। শীলখালী রেঞ্জের শীলখালী সদর বিটে ৪০ হেক্টরে ১লাখ, মাথাভাঙ্গা বিটে ৪০ হেক্টরে ১লাখ গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। এছাড়া হোয়াইক্যং রেঞ্জের হোয়াইক্যং বিটে ১শ ৯০হেক্টরে ৪লাখ ৭৫হাজার, মনখালী বিটে ৩০হেক্টরে ৭৫হাজার গাছের চারা রোপন করা হয়েছে বলে বনবিভাগ সুত্র জানায়।

অপরদিকে উখিয়া উপজেলার উখিয়া রেঞ্জের থাইংখালী বিটে ১শ ৫০হেক্টরে ৩লাখ ৭৫হাজার, দোছড়ি বিটে ৫০হেক্টরে ১লাখ ২৫হাজার ও উখিয়া সদর মধুরছড়া বিটে ৬০ হেক্টরে ১লাখ ৫০হাজার গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। রাজারকুল রেঞ্জাধীন উখিয়া উপজেলার পাগলিরবিল বিটে ৫০হেক্টরে ১লাখ ২৫হাজার বৃক্ষ রোপন করা হয়। এছাড়া ইনানী রেঞ্জের রাজাপালং বিটে ৫০হেক্টরে ১লাখ ২৫হাজার, জালিয়াপালং বিটে ৫০হেক্টরে ১লাখ ২৫হাজার ও ইনানী সদর বিটে ৫০হেক্টরে ১লাখ ২৫হাজার বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে। চোয়াংখালী বিটে ৯০ হেক্টর বনভুমিতে ২লাখ ২৫হাজার বৃক্ষের চারা রোপন করা হয়েছে। এছাড়া উপকুলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রামের আওতায় টেকনাফের হ্নীলা বিটের জাদীমুড়া থেকে চৌধুরীপাড়া পর্যন্ত বাঁধ বনায়নে ১লাখ ও চৌধুরীপাড়া এলাকায় ১লাখ ১১হাজার ১শ টি ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা রোপনের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

বনবিভাগ জানায়, অর্জুন, হরতকি, বহেরা, চিকরাশি, জারুল, কাজলভাদী, গর্জন, সিভিট, পলাশ, বকুল, সিলকড়ি, চাকুয়া, কড়ই, সেগুন, গামার, ধারমারা, সোনালো, কৃষ্ণচুড়া, ছাতিয়ান, কাঞ্চন, বুদ্ধ নারিকেল, শিমুল, বক্সবাদম, কাঠবাদাম, আমলকি, জলপাই, কালোজাম, পুতিজামসহ ৫৬টি বিপন্ন প্রজাতির দেশীয় উদ্ভিদের চারা। বনবিভাগ সূত্র জানায়, সৃজিত বাগান সমুহ দীর্ঘ মেয়াদী। এছাড়া ওষুধী, ফলজ ও বনজ বৃক্ষরাজি।

এক সময় কাঠুরিয়াদের দিয়েই পাহাড় থেকে কাঠ বা লাকড়ি সংগ্রহ করা হতো। পাহাড় থেকে সংগ্রহকৃত কাঠ বা লাকড়ী, স্থানীয়রা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করতেন। কালের পরিবর্তে এখন কাঠ বা লাকড়ীর ব্যবহার অনেকটা কমে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়াচে মানুষ এখন পাহাড় বিমুখ হয়ে পড়েছে। তারা গ্যাস বা অন্যকিছু জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করছেন। লোকজনের মতে, ২০১৭সনে টেকনাফ-উখিয়ায় লাখ লাখ রোহিঙ্গার আগমনের ঘটে। এরপর থেকে পাহাড়ী জনপদ; সবুজ এই বনভুমি অনেকটা অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পাহাড় কেন্দ্রীক ডাকাতি, অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যের কারণে টেকনাফ-উখিয়ার পাহাড় সমুহ রীতিমত এক আতংকের নাম। কাঠুরিয়া এমনকি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করা প্রান্তীক কৃষকদের জন্যও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে এখানকার বনাঞ্চল। ভয়ে আতংকে লোকজন পাহাড়ে যেতে পারেন না। ফলে পাহাড় সমুহ এখন নির্জন এবং নিরবতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে উল্লেখিত কারণে এবারকার সৃজিত বাগান অক্ষুন্ন এবং দীর্ঘ মেয়াদী থাকবে। তাদের মতে, মানুষ দিন দিন সচেতন হচ্ছেন। সবুজ বনায়নের প্রতি মানুষের আকৃষ্ট যেমন বাড়ছে। তেমনি কারণে অকারণে পাহাড় নির্ভর মানুষের সংখ্যা একেবারেই কমে যাচ্ছে। এছাড়া ডাকাত বা অপহরণ আতংকের কারণে সাধারণ মানুষ দিন দিন পাহাড় বিমুখ হয়ে পড়ায় টেকনাফ ও উখিয়ার বনাঞ্চলে সৃজিত নতুন বাগানে অপার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। সৃজিত ১২ লক্ষ গাছের মধ্যে ওষুধী ফলজ ও বনজ বৃক্ষ রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদী এইসব গাছ বড় হয়ে অক্সিজেন দিবে। পাশাপাশি আগামীতে উখিয়া-টেকনাফের ঘনবসতি এলাকায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উল্লেখিত বৃক্ষরাজি এক অপরিসীম ভুমিকা রাখবে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীসহ সংশ্লিষ্টরা।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনিক চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ৫বছরে ২৫কোটি বৃক্ষরোপনের আলোকে ইতোমধ্যে আমাদের কর্মযজ্ঞ শুরু শুরু হয়েছে। বনবিভাগ কর্তৃক টেকনাফের বনাঞ্চলে ১২লাখ চারা রোপনের পাশাপাশি চলতি মৌসুমে উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদ্যোগেও পৃথক ১০হাজার চারা রোপন করা হয়েছে। ফলজ বনজ ও ওষুধি গাছের এসব চারা বড় হয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করবে পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখবে জানিয়ে তিনি বনাঞ্চলে এবং স্থানীয়ভাবে সৃজিত বৃক্ষরাজি রক্ষায় স্থানীয় এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগীতা কামনা করেছেন। কক্সবাজার বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই ১হাজার ১শ ৩হেক্টর বনভুমিতে সাড়ে ২৭লাখ গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদী সৃজিত এসব বাগানে ফলজ বনজ ওষুধিসহ প্রায় ৫৬ প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সৃজিত বৃক্ষরাজি রক্ষায় বনবিভাগ কাজ করবে।