পাঁচ বছর ধরে রমেক হিমঘরে ভারতীয় নাগরিকের লাশ
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুর ব্যুরো
পরিবার আছে, পরিচয় আছে, আছে পাসপোর্টও। কিন্তু তার শেষকৃত্য হয়নি। লাশও পৌঁছায়নি পরিবারের কাছে। শুধু আইনি জটিলতা ও পরিবারের অনাগ্রহের কারণে প্রায় পাঁচ বছর ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে একটি নম্বরবন্দি লাশ।
হৃদয়স্পর্শী এ ঘটনাটি ঘটেছে প্রবীর মণ্ডলের সাথে। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নিমচা মৈত্রী স্ট্রিটের এম আলম বাজার এলাকার বাসিন্দা। মৃত্যুর সময় প্রবীর মণ্ডলের বয়স ছিল ৪১ বছর। তার বাবা মহাদেব মণ্ডল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর থেকে রমেক হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে লাশটি সংরক্ষিত রয়েছে। পরিবার, ভারতীয় হাইকমিশন এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া লাশ সৎকার সম্ভব হচ্ছে না।
পুলিশ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, একাধিকবার যোগাযোগের পরও প্রবীর মণ্ডলের পরিবার লাশ গ্রহণে আগ্রহ দেখায়নি। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের নভেম্বরে ফেসবুকে পরিচিত এক নারী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রামে আসেন প্রবীর মণ্ডল। সেখানে আজিজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে অবস্থানকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। এরপর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর পাটগ্রাম থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়।
প্রবীর মণ্ডলের পোশাক থেকে উদ্ধার হওয়া ভারতীয় পাসপোর্টে দেখা যায়, তিনি ২০১৭ সালের ৩ মার্চ তিন মাসের ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফিরে যান। তবে এরপর কীভাবে তিনি আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, সে বিষয়ে মামলার নথিতে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর একটি মেডিকেল লিগ্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। সেই থেকে লাশ হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষিত রয়েছে।
লালমনিরহাট জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তখনই লাশে পচন শুরু হয়েছিল। একই চিঠিতে বিজিবির মাধ্যমে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে লাশ ভারতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়। তবে ৪ বছর ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।
পাটগ্রাম থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রমজান আলী বলেন, প্রবীর মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত লাশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি।
তিনি বলেন, বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত এলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রবীর মণ্ডলের ছোট ভাই সুবীর মণ্ডলের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ রাখছি, কিন্তু তারা লাশ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
রমেক হাসপাতালের হিমঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল বসুনিয়া বলেন, লাশটি এখনো হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পেলেই ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী লাশের সৎকার বা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা শুধু সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করছি।
রমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক আব্দুল মোকাদ্দেম বলেন, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে প্রবীর মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর পর থেকে তার লাশ হিমঘরে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের অনুরোধেই লাশ সংরক্ষণ করা হয়েছে। পুলিশ যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখনই লাশ হস্তান্তর করা হবে। আমরা শুধু সংরক্ষণের দায়িত্বে আছি। প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি লাশ হিমঘরে পড়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, বাংলাদেশের নীতি-রীতি অনুযায়ী এই লাশটিকে সৎকার করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এটা না করাতে একজন মৃত ব্যক্তিরও যে মানবাধিকার আছে- সেটি লঙ্ঘিত হয়েছে। একজন মৃত ব্যক্তির সৎকার করার দায়ভার রাষ্ট্র বহন করবে- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও বাংলাদেশের সংবিধানেও এটি উল্লেখ আছে। আমরা মনে করি, সরকারের এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত ছিল এবং সময়মতো এই কাজটি সম্পন্ন করা উচিত ছিল। রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন বলেন, প্রবীর মণ্ডলের মৃত্যুর সময় দেশে-বিদেশে করোনা মহামারির প্রভাব ছিল। সে সময় সীমান্তে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সম্ভবত লাশ গ্রহণে আগ্রহী হয়নি।
তিনি আরও বলেন, এখন পরিবারের অনাগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে লাশটি সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে। যেহেতু পরিবার লাশ নিতে চাচ্ছে না, আমরা চিন্তা করছি এটাকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই সকলের সম্মতিতে ও পরিবারের অনাপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে সৎকার করতে পারি।
