আখ চাষে বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধুই সবুজের সমারোহ। বাতাসের দোলায় হেলেদুলে ওঠা আখের পাতার খসখস শব্দে যেন এক অপূর্ব সুর বাজে চাষীদের কানে। মাঠের পর মাঠ জুড়ে আখের এই বাম্পার ফলন শুধুই এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং শত শত কৃষক পরিবারের মুখে ফুটিয়েছে স্বস্তির অমলিন হাসি। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে ব্যাপকভাবে আখের চাষ হয়েছে।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকা আর কৃষকদের ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের সমন্বয়ে মাঠে মাঠে দেখা দিয়েছে সাফল্যের নতুন এক রূপকথা। চান্দিনার কৃষকদের জন্য আখের এই ভালো ফলন শুধু একটি ভালো ফসলের গল্প নয়, বরং এটি দারিদ্র্য দূর করে অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এক নির্ভরযোগ্য পথ। সবুজ পাতার নিচে উঁকি দেওয়া প্রতিটি রসালো আখ যেন একেকটি স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন। বর্তমান বাজারে চান্দিনার আখের চাহিদা ও দাম দুটোই চড়া, যা কৃষকদের মুখে বাড়তি আনন্দের রেখা ফুটিয়ে তুলেছে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতে কেনাবেচার ধুম পড়েছে। খুচরা বাজারে বড় আকারের একেকটি আখ বিক্রি হচ্ছে দেড়শ থেকে একশ সত্তর টাকায়। এমনকি তুলনামূলক মাঝারি বা ছোট সাইজের আখও অনায়াসে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে একশ থেকে একশ বিশ টাকায়। সাধারণ ক্রেতারা যেমন তাজা ও মিষ্টি আখের স্বাদের জন্য মুখিয়ে থাকেন, তেমনি চাষীরাও তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টের সঠিক মূল্যায়ন পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত। দাম ভালো পাওয়ায় তাদের পরিশ্রমের প্রতিটি মুহূর্ত যেন সার্থক মনে হচ্ছে।
স্থানীয় অর্থনীতির পালে হাওয়া লাগাতে এই আখ চাষ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চান্দিনার সাধারণ ধান বা অন্যান্য প্রথাগত শস্যের পাশাপাশি আখ চাষকে ঘিরে এখন এক নতুন অর্থনৈতিক গতিশীলতা তৈরি হয়েছে। চাষীরা জানান, অন্যান্য লাভজনক ফসলের তুলনায় আখ চাষে মূলধনী খরচ অনেকটাই কম। স্বল্প খরচে চাষ শুরু করে এত বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন অন্য খুব কম ফসলেই সম্ভব হয়। কম খরচে অধিক লাভের এই অনন্য সমীকরণ চান্দিনার কৃষিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিবার এখন আখ চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন এবং একে জীবনের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করছেন।
তবে এই সোনালি সাফল্যের পেছনের গল্পটি শুধু হিসাব-নিকাশের নয়, এর পেছনে রয়েছে সার্বক্ষণিক তদারকি ও ত্যাগের এক গভীর অধ্যায়। মুখে হাসি থাকলেও কৃষকরা অকপটে স্বীকার করেন যে আখ চাষে যেমন খরচ কম এবং লাভ বেশি, তেমনি যত্ন ও পরিশ্রমের ঘাটতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বীজ রোপণ থেকে শুরু করে একদম পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত সব সময় খেতের নিবিড় পরিচর্যা করতে হয়। ক্ষতিকর পোকাণ্ডমাকড় দমন, নিয়মিত পানি সেচ দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা এবং প্রতিটি আখগাছ যাতে সোজা হয়ে বাড়তে পারে সেদিকে নজর রাখা সবমিলিয়ে একটি দিনের জন্যও গাফিলতি করার সুযোগ থাকে না। সামান্য ভুলের কারণে প- হয়ে যেতে পারে পুরো মৌসুমের রক্তপানি করা চেষ্টা।
ভোরের সূর্য ওঠার আগেই চান্দিনার কৃষকেরা কোদাল, কাঁচি হাতে ছুটে যান তাদের প্রিয় আখখেতে। প্রখর রোদ, বৃষ্টি কিংবা ক্লান্তি কোনো কিছুই তাদের এই নিয়মিত তদারকিতে বাধা হতে পারে না। দিনান্তের এই ঘাম ঝরানো পরিশ্রমই দিনশেষে তাদের ঘরে ফিরিয়ে আনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। চান্দিনা উপজেলার মেঠো পথ ধরে হেঁটে গেলে কিংবা আখের হাটে ঢুকলে স্পষ্ট টের পাওয়া যায় এই পরিবর্তনের ছোঁয়া। আখের মিষ্টি রসে যেন ধুয়ে-মুছে যাচ্ছে শত শত কৃষক পরিবারের পুরনো অভাব-অনটনের কষ্ট। দিগন্তজোড়া মাঠের দিকে তাকালে আজ শুধু সবুজ আখ গাছই চোখে পড়ে না, সেখানে দৃশ্যমান হয় চান্দিনার হাজারো কৃষকের ঘুচে যাওয়া কষ্টের গল্প আর এক সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের মিষ্টি রূপরেখা।
