নিলামে রেকর্ড দামে এনটিসির চা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানগুলোতে এবার যেন নতুন সম্ভাবনার বার্তা। অনুকূল আবহাওয়া, বাড়তি উৎপাদন, কাঁচা পাতার মানোন্নয়ন এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের সুফল মিলেছে আন্তর্জাতিক চা-নিলামে। চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আন্তর্জাতিক চা নিলামে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গড় দামে চা বিক্রি করে নতুন রেকর্ড গড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড (এনটিসি)।

৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত নিলামে এনটিসির অধীন ১২টি চা-বাগানের মোট ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৬০ কেজি চা বিক্রি হয়। প্রতি কেজি চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ২৮০ টাকা ৫৯ পয়সা। এটি এনটিসির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গড় বিক্রয়মূল্য। সরকার নির্ধারিত ২৪৫ টাকা ভিত্তিমূল্যের তুলনায় প্রতি কেজিতে গড়ে ৩৫ টাকা ৫৯ পয়সা বেশি দামে চা বিক্রি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৭৩ হাজার ৭২২ টাকা। এই রেকর্ড শুধু একটি নিলামের সাফল্য নয়; বরং দীর্ঘদিন নানা সংকটে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত চা শিল্পে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জের চারটি চা-বাগানের উৎপাদন ও মানোন্নয়ন এ সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এবারের নিলামে অংশ নেওয়া এনটিসির ১২টি বাগানের মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর ও তেলিয়াপাড়া এবং চুনারুঘাট উপজেলার চন্ডিছড়া ও পারকুল চা-বাগান। পাশাপাশি মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার কয়েকটি বাগানের চাও নিলামে ওঠে।

এসব বাগানে উৎপাদিত উন্নতমানের অর্থোডক্স ও সিটিসি চায়ের কয়েকটি লট প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। নিলামে ক্রেতাদের আগ্রহ এবং ভালো দাম পাওয়াকে বাগানগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও গুণগত মানোন্নয়নের ইতিবাচক ফল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

জগদীশপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক মনির উদ্দিন বলেন, চলতি বছর বৃষ্টিপাত গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বাগানে চা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তিনি বলেন, সরকার চলতি বছর চা পাতার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।

এনটিসির বাগানগুলোতে উৎপাদিত কাঁচা পাতার গুণগত মান ভালো হওয়ায় নিলামে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে। ভালো মানের কাঁচা পাতা ও সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে বাজারে এনটিসির চায়ের চাহিদাও বেড়েছে।

চায়ের গুণগত মান নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে বাগান পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। বিশেষ করে কাঁচা পাতা সংগ্রহের ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক দেওয়ান বাহাউদ্দিন লিটন জানান, প্রমিকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত তদারকি এবং নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে পাতা সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে ‘দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি’ চয়ন নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করায় কাঁচা পাতার মান আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে উৎপাদিত চায়ের রং, ঘ্রাণ ও স্বাদে।

তার মতে, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে ভালো মানের চায়ের চাহিদা সবসময়ই রয়েছে। তাই উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি চায়ের গুণগত মান ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এনটিসির উৎপাদনেও চলতি মৌসুমে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত এনটিসির চা উৎপাদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।

উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রম ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কারখানায় উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ফলে উৎপাদন ও বিক্রি- দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

চা উৎপাদনের সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। পর্যাপ্ত বৃষ্টি, উপযুক্ত তাপমাত্রা ও মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা চা-গাছের কুঁড়ি ও পাতার বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের চা শিল্পকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক মজুরি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি।

তবে চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত চা-বাগানগুলোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বাগানগুলোতে নতুন কুঁড়ি ও পাতা উৎপাদন বেড়েছে। একই সঙ্গে কাঁচা পাতার মান ভালো থাকায় কারখানায় প্রক্রিয়াজাত চায়ের মানও উন্নত হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত চা-বাগানগুলোর জন্য গত কয়েক বছর ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, পুরোনো ব্যবস্থাপনা কাঠামো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বাজার প্রতিযোগিতা-সব মিলিয়ে এনটিসিকে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। তবে চলতি মৌসুমের উৎপাদন ও নিলামের ফলাফল সেই পরিস্থিতি বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এনটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হাসান বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বাগান শ্রমিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বাগানগুলো ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানোন্নয়নে নেওয়া বিশেষ কর্মসূচির সুফল এখন দৃশ্যমান। আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলতি মৌসুমের বাকি সময়ে আরও ভালো উৎপাদন ও বিক্রির প্রত্যাশা করছেন তারা।

চায়ের বাজারে ভালো দাম পাওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর। তবে এ সাফল্য ধরে রাখতে হলে উৎপাদন ও মান-দুই দিকেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। কারণ আন্তর্জাতিক চায়ের বাজারে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অনুকূল আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। উন্নত জাতের চারা, বৈজ্ঞানিক বাগান ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক কারখানা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

এনটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হাসানও প্রতিষ্ঠানটিকে আরও লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের চারা রোপণ, কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত চা-বাগানগুলো আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারে। হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাটের চা-বাগানগুলো শুধু জেলার অর্থনীতির অংশ নয়, এসব বাগানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শ্রমিকের জীবন-জীবিকা। উৎপাদন বাড়লে যেমন বাগানগুলোর আয় বাড়ে, তেমনি শ্রমিক ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। চট্টগ্রামের নিলামে এনটিসির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গড় দামে চা বিক্রির ঘটনা তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হবিগঞ্জের চার বাগানসহ রাষ্ট্রায়ত্ত চা-বাগানগুলোর সম্ভাবনারও নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।

অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত কাঁচা পাতা, দক্ষ শ্রমিক, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটানো গেলে এ রেকর্ড সাময়িক কোনো সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না- বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চা শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

চট্টগ্রামের নিলামে রেকর্ড দামে চা বিক্রির এই সাফল্য তাই শুধু এনটিসির হিসাবের খাতায় নতুন রেকর্ড নয়; হবিগঞ্জের চা-বাগানসহ দেশের চা শিল্পে নতুন সম্ভাবনারও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।