ছেলের ৬০ লাখ টাকার প্রাসাদে আশ্রয় মিলেনি মায়ের

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

মায়ের গর্ভে সন্তান, মায়ের কষ্টে সন্তান বড় হয়ে আর সেই সন্তানই যখন মায়ের শেষ বয়সের আশ্রয় না হয়ে দাঁড়ায় নির্মমতার কারণ, তখন তা শুধু পারিবারিক ঘটনা নয়; মানবিকতার জন্যও এক গভীর প্রশ্ন। এমনই হৃদয়বিদারক অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার রাজগাতি ইউনিয়নের উলুহাটি মাইজপাড়া গ্রামে। অভিযোগ, প্রায় ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছাকে প্রায় এক বছর ধরে পায়ে শিকল বেঁধে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরের বারান্দায় রাখা হয়েছে। অথচ তার ঠিক সামনেই প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারতলা ফাউন্ডেশনের একটি আলিশান বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন তার বড় ছেলে ইকবাল হোসেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঝকঝকে টাইলসে মোড়ানো ওই বাড়িতে রয়েছে ১২টি আধুনিক কক্ষ, পানি ও আইপিএসের সুবিধাসহ নানা আধুনিক ব্যবস্থা। কিন্তু ওই বাড়ির সামনেই ঝোপঝাড়ে ঘেরা ছোট্ট টিনের ঘরের বারান্দায় মানবেতর জীবন কাটছে বৃদ্ধা মা মেহেরুন্নেছার। মেহেরুন্নেছা ওই গ্রামের মৃত আব্দুস সামেদ ভুইয়ার স্ত্রী।

সরে জমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝোপঝাড়ে ঘেরা একটি ছোট টিনের ঘরের বারান্দায় মেঝেতে পড়ে আছেন তিনি। পরনে ছিল ময়লা একটি কাপড়। সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য ছিল তার ডান পায়ে মোটা শিকল বাঁধা। শিকলের অপর প্রান্তটি ঘরের ভেতরের একটি খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে আটকানো। বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুতে ফুটে ওঠে অসহায়ত্ব ও কষ্টের চিত্র। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে পুত্রবধূ গেনেদা বেগম দ্রুত এসে বৃদ্ধার মুখ চেপে ধরে তাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। বৃদ্ধাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার বিষয়ে তার পুত্রবধূ গেনেদা বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, তার শাশুড়ি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ নেই এবং তাকে ছেড়ে দিলে এদিক-সেদিক চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই তার স্বামী মাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করেছেন বলে জানান তিনি। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, স্বামী আব্দুস সামেদ ভুইয়া মারা যাওয়ার পর মেহেরুন্নেছা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরবর্তীতে পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, বয়সের ভারে মেহেরুন্নেছা এমনিতেই শারীরিকভাবে দুর্বল। তিনি ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। লাঠিতে ভর দিয়ে কোনো রকমে দু-এক কদম চলাফেরা করতে পারেন। এমন একজন বৃদ্ধা নিজে থেকে দূরে চলে গিয়ে হারিয়ে যাবেন এমন যুক্তিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৃত আব্দুস সামেদ ভুইয়ার তিন ছেলে। অন্য দুই ছেলে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তির অংশ বুঝে নিয়ে তা বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছেন। বড় ছেলে ইকবাল হোসেন ঢাকায় ব্যবসা করেন বলে স্থানীয়রা জানান। তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে উলুহাটি মাইজপাড়ার বাড়িতেই বসবাস করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারার পর থেকেই বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছার ঠাঁই হয় বাড়ির সামনের ওই পরিত্যক্ত টিনের ঘরে। বিশাল ভবনের সামনে মাত্র কয়েক হাত দূরে তার এমন মানবেতর জীবনযাপন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। ঘটনার বিষয়ে জানতে বড় ছেলে ইকবাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।

তার স্ত্রী জানান, ইকবাল পাশের একটি বাজারে গেছেন। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার অভিযোগের বিষয়ে ইকবাল হোসেনের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, একজন মা নিজের জীবন-যৌবন ত্যাগ করে সন্তানদের বড় করেছেন। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার ভাগ্যে জুটেছে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘর এবং পায়ে শিকল। সন্তানদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মাকে এমন অবস্থায় রাখা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাদের দাবি, বৃদ্ধার প্রকৃত শারীরিক ও মানসিক অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে তাকে শিকলমুক্ত করে নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাতেমা জান্নাত বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক ও অমানবিক। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত ঘটনাটি তদন্ত করে বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছার নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করবে।

একই সঙ্গে যদি বৃদ্ধাকে অবৈধভাবে আটকে রাখা বা নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।