তিস্তার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা-ফসলি জমি

আতঙ্কে তীরবর্তী মানুষ

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  স্বপ্না আক্তার, নীলফামারী

তিস্তা নদীর পানি বাড়া-কমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নদীভাঙন। বর্ষা মৌসুমে কখনো নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, আবার কয়েকদিন পর পানি নেমে যাচ্ছে বিপদসীমার নিচে। আর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র স্রোতে শুরু হচ্ছে নদীর পাড় ভাঙন। এতে প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি, বসতভিটা, গাছপালা ও বিভিন্ন স্থাপনা। নদীভাঙনের কারণে তিস্তা তীরবর্তী মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক।

নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার তিস্তা নদীসংলগ্ন বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষের জীবনযাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই নদীর খেয়াল-খুশির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা এলেই নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ায় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমিতে পানি ঢুকে পড়ে। আবার পানি নামতে শুরু করলেই তীব্র স্রোতে নদীর পাড়ে দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন।

স্থানীয়রা জানান, নদীর পানি কমার পরপরই বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নদীর পাড়ের বড় অংশ নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এতে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে নদীর তীরবর্তী বসতবাড়ি ও ফসলি জমি। ভাঙনের মুখে থাকা পরিবারগুলো ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও অনেকেরই অন্যত্র যাওয়ার মতো জায়গা বা আর্থিক সামর্থ্য নেই।

নদীভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। বছরের পর বছর যে জমিতে তারা ফসল ফলিয়ে সংসার চালিয়েছেন, সেই জমিই এখন তিস্তার গর্ভে বিলীন হচ্ছে। একবার জমি নদীতে চলে গেলে শুধু জমিই হারাচ্ছেন না, হারাচ্ছেন তাদের আয়ের প্রধান উৎসও। অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিস্তার ভাঙনে শুধু জমি ও বসতভিটাই নয়, স্থানীয় সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়ছে। কোথাও নদী খুব কাছে চলে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

তিস্তা তীরবর্তী বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভাঙন রোধে বিভিন্ন সময়ে জিও ব্যাগসহ নানা ধরনের সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নদীর গতিপথ ও স্রোত নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না। ফলে এক জায়গায় ভাঙন ঠেকানো হলেও অন্য জায়গায় নতুন করে ভাঙন শুরু হচ্ছে। প্রতিবছরই একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

স্থানীয়দের দাবি, তিস্তা নদীর ভাঙন থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পেতে হলে পরিকল্পিত নদীশাসনের কোনো বিকল্প নেই। শুধু ভাঙন শুরু হওয়ার পর জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে পাড় রক্ষা না করে নদীর গতিপথ, তীর সংরক্ষণ ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এদিকে বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানি ওঠানামার কারণে বন্যা ও ভাঙন- দুই ধরনের দুর্ভোগই পোহাতে হচ্ছে নদীপাড়ের মানুষকে। পানি বাড়লে বন্যার আশঙ্কা, আর পানি কমলে ভাঙনের আতঙ্ক- এই দুই সংকটের মধ্যেই কাটছে তাদের দিন-রাত। শুষ্ক মৌসুমে আবার নদীর বিস্তীর্ণ অংশ জেগে উঠে বালুচরে পরিণত হওয়ায় দেখা দেয় পানিশূন্যতা। ফলে তিস্তা তীরবর্তী মানুষের জীবনযাত্রায় দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। তিস্তা নদীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, কৃষি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ তিস্তা তীরবর্তী মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন সম্ভব।

সম্প্রতি তিস্তার ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেন এবং নদীভাঙন ঠেকাতে তাৎক্ষণিকভাবে জিও ব্যাগ ফেলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে তিস্তা তীরবর্তী মানুষের এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা আশ্বাসের দ্রুত বাস্তবায়ন। তাদের দাবি, নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রতিবছরই নতুন করে হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হারিয়ে যাবে আরও আবাদি জমি ও বসতভিটা। তাই দ্রুত কার্যকর নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান চান তারা।

তিস্তার ভাঙন যেন এখন নদীপাড়ের মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ জীবন চান তিস্তা তীরবর্তী মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে রক্ষা পাবে বসতভিটা, আবাদি জমি ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন; কমবে বন্যা-ভাঙনের আতঙ্ক, ফিরবে নদীপাড়ের মানুষের স্বস্তি।