চুয়াডাঙ্গায় বাড়ছে পাট চাষ মাঠজুড়ে কর্মব্যস্ততায় চাষিরা

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

এক সময় পাটকে বলা হতো সোনালি আঁশ। পাট ঘিরে কৃষকের স্বপ্ন- ফসল ঘরে উঠবে, বাজারে ভালো দাম মিলেছে, আর সেই টাকা দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মিটবে। সম্প্রতি ভারি বৃষ্টি কারণে খাল, বিল ও বিভিন্ন জলাশয় নতুন পানিতে ভরে উঠেছে। পর্যাপ্ত ও পরিষ্কার পানি পাওয়ায় চাষিরা এখন পাট কাটা, জাগ দেয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দাম ভালো পাওয়ায় তারা এবার লাভের আশা দেখছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি বিভাগের মতে, এ বছর জেলায় ২৫ হাজার ৫৭৮ মেট্রিক টন পাট উৎপাদন হয়েছে।

সরেজমিন জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, কোথাও কৃষকেরা পাট কাটছেন, কোথাও জাগ দিচ্ছেন। আবার কোথাও কৃষকেরা পাটের আঁশ ছাড়িয়ে ধোয়া ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত। মাঠজুড়ে কৃষকরা এখন পাট ঘরে তোলার শেষ সময়ের কর্মব্যস্ততায় মুখিয়ে পড়েছে।

অপরদিকে চলতি মৌসুমে রোগবালাইয়ের প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকায় পাটের বৃদ্ধি অত্যন্ত আশানুরূপ। তবে সার, বীজ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে। জেআরও-৫২৪ ও বিজেআরআই তোষা পাট-৮ জাতের পাট চাষ করেছেন কৃষকরা। প্রতি হেক্টর জমিতে প্রায় ২ দশমিক ৮ মেট্রিক টন পাট উৎপাদন হয়েছে। স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৩০০টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভাল ফলন ও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। চুয়াডাঙ্গার চারটি উপজেলায় এ মৌসুমে ৯ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। গত বছরের চেয়ে ৪৩৫ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ হয়েছে।

জেলার একাধিক কৃষকরা জানান, কয়েক বছর আগেও পাট চাষে লাভের চেয়ে লোকসানের আশঙ্কাই ছিলো বেশি। কিন্তু এবার উৎপাদন ভালো হওয়ায় এবং বাজারে দাম সন্তোষজনক থাকায় পাট আবারো লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে। তাই অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে পাটের আবাদ আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।

বর্তমানে সোনালি আঁশ পাটের মৌসুম চলছে। গ্রামবাংলায় এখন এটি চিরচেনা দৃশ্যে মাঠে পাটচাষিরা জমি থেকে কাঁচা পাটগাছ কেটে কয়েকদিন জমিতে টিবি করে রাখে। এরপর পাটের পাতাগুলো ঝড়ে গেলে পানিতে ডুবিয়ে জাগ দেওয়া। পানিতে থাকা অবস্থায় পচন ধরে পাটের সবুজ আঁশ নরম হয়। এরপর আঁশ ছাড়িয়ে নিলেই পাওয়া যায় সোনালি আঁশ।

দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ালগাছি এলাকায় কৃষকরা জমি থেকে পাট পানিতে নামিয়ে পচনের জন্য জাগ দিচ্ছে। পাটের জাগকে পানির নিচে ডুবিয়ে রাখতে জাগের উপরে মাটি দিয়ে ভরা দিতে হয়। এতে পাট পানির নিচ থেকে উপরের দিকে উঠতে পারে না। সঠিকভাবে পানিতে ডুবাতে না পারলে পাটে পচন ধরে না। আর পচন না ধরলে আঁশে পরিণত হয় না। আর আঁশ না হলে ওই পাট দিয়ে কিছুই করা যায় না। অপরদিকে একই উপজেলার কুতুবপুর, মুন্সিপুর এলাকায় চাষিরা পাটের শোলা থেকে আঁশ ছাড়িয়ে নিচ্ছে। এরপর পাটগুলো রোদে শুকানোর পরই বাজারজাত করার উপযোগী হয়।

কুড়ালগাছি গ্রামের পাটচাষি রবিউল ইসলাম বলেন, একসময় পাটের চাষ করা হতো অন্য ফসল বাদ দিয়ে। দরপতন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও জাগ দেওয়ার পানির সংকটে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন অনেক কৃষক। তবে এবার পরিস্থিতি বদলে গেছে। গত বছর থেকেই দাম বেড়ে যাবার ফলে এ বছর পাটের চাষ বেশি হয়েছে। ফলে সোনালি আঁশ নিয়ে আবারো স্বপ্ন কুড়ালগাছি এলাকার পাটচাষিরা।

পীরপুরকুল্লা কৃষক রাজা মিয়া বলেন, ভাল বাজার দর, অনুকূল আবহাওয়া, সময়মত বৃষ্টিপাত, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষি বিভাগের সহায়তায় চলতি মৌসুমে উপজেলায় পাটের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি ভাল ফলন ও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় আবারো সোনালি আঁশের এই অর্থকরী ফসলের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।

জীবননগর উপজেলার কৃষক ইয়াসিন আলী বলেন, আগে পাটের দাম কম থাকায় চাষ কমিয়ে দিয়েছিলাম। গত বছর ভাল দাম পাওয়ায় এবার দুই বিঘা জমিতে পাট করেছি। ফলনও ভাল হয়েছে। আশা করছি আশানুরূপ মুনাফা আয় হবে। আরেক কৃষক জাকার আলী বলেন, এবার পাটের ফলন বেশ ভাল হয়েছে। বাজারে দামও ভাল। শুধু পাটের আঁশ নয়, পাটকাঠিরও চাহিদা রয়েছে। এতে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। কৃষকদের পাট চাষে উদ্বুদ্ধ করতে সরকার প্রণোদনা দিচ্ছে। পাশাপাশি পাটের ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উন্নত জাতের বীজ, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আগ্রহের কারণে এবার পাটের আবাদ বেড়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ২২০ কোটি টাকার পাট বিক্রি হবে এবার। আশা করছি, আগামী বছর পাটের আবাদ আরো ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে।