চুয়াডাঙ্গায় আমন রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শরীফ উদ্দীন, চুয়াডাঙ্গা

আষাঢ়-শ্রাবণ মাস বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র্যে বর্ষাকাল। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষকের জন্য আমন ধানের চারা রোপণের সুবর্ণ সময় এই বর্ষাকাল। কখনো বিস্তীর্ণ আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের আস্তরণ। মুহূর্তেই আবার কালো মেঘে ভারী বৃষ্টি। এই রোদণ্ডবৃষ্টির খেলার মধ্যেই ভোরের আলো ফুটতেই কাঁধে ধানের চারা, হাতে কোদাল আর চোখে নতুন স্বপ্ন নিয়ে মাঠে ছুটছেন কৃষকরা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কৃষি শ্রমিকদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে গ্রামের মাঠ। কোথাও বীজতলা থেকে চারা তোলা হচ্ছে, কোথাও সারিবদ্ধভাবে চলছে রোপণ। প্রকৃতি আর মানুষের পরিশ্রম মিলে লিখছে নতুন সম্ভাবনার গল্প। কাঁদা মাটিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক ধানের চারা রোপণের দৃশ্য দেখে মনে হয়, যেন সবুজের বিশাল এক ক্যানভাস আঁকছেন তারা। বৃষ্টির মৌসুম শুরুতে একটু বৃষ্টি কম হলেও বর্তমান যথেষ্ট পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় খাল বিল ডোবা নালা পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। তাই কৃষকরা উঁচু-ডোবা জমি থেকে আগাম পাট কেটে সেই জমিতে আমন ধান রোপণ করেছে। তবে বর্তমান— উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধান চাষ ও পরিচর্যা করতে গিয়ে আর্থিক সংকট ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে চুয়াডাঙ্গা জেলার কৃষকদের। তাদের দাবি, লিটারে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়ায় এবার পাওয়ার টিলার মালিকরা গত মৌসুমের চেয়ে প্রতি বিঘায় ৩০০ টাকা চাষ খরচ বেশি নিচ্ছে। এছাড়া সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়েছে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। অথচ বাজারে ধানের দাম কম। এ অবস্থায় সরকারের কাছে ধানের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করার দাবি তাদের। গত বছরের চেয়ে বিঘা প্রতি হাল চাষে খরচ বেড়েছে ৩০০ টাকা, রোপণ করতে কৃষি শ্রমিকরা বেশি নিচ্ছেন ৫০০ টাকা, সংকটের অজুহাতে খুচরা বাজারে সারের দাম বস্তা প্রতি বেড়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, কীটনাশকের দাম বেড়েছে ৫০০ টাকা। আবার বীজ ও সেচসহ অন্যান্য খরচতো আছেই। সবমিলে এবার এক বিঘা জমিতে আমন ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে জমির দামসহ ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা। অথচ গত বছর আমন চাষে খরচ হয়েছে সর্বোচ্চ ২১ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে হয়তো এবার বিঘা প্রতি ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ২০ মণ ধান উৎপাদন হতে পারে। কিন্তু খরচ অনুপাতে ধানের নায্য দাম যদি না পাওয়া যায়, তাহলে গত আলু, পিয়াজ ও বোরো মৌসুমের মতই আমনেও লোকসান গুণতে হবে। জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ৩৬ হাজার ৭৮১ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ইতোমধ্যে ৩০ ভাগ জমিতে আমন চাষ সম্পন্ন হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলোকদিয়া গ্রামের কৃষক সোহাগ হোসেন বলেন, ফসল চাষ করে লাভ হচ্ছে না। আলুতে লোকসানের কারণে ঋণ করে বোরো চাষ করেছি। কিন্তু বাজারে ধান বিক্রি করতে গিয়ে দাম পাইনি। বিঘাপ্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। সব জিনিষের দাম বাড়লেও ধানের দাম নাই। ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় এবার চাষ খরচই নিচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকা। আগে ছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। আবার ৫০০ টাকার নিচে কোন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। সারের দামও বেশি। এজন্য বিঘাপ্রতি এবার চার-পাঁচ হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। অথচ ধানের দাম কম।বুকভরা কষ্ট নিয়ে রবিউল ইসলাম বলেন, এনজিও থেকে লোন নিয়ে গত মৌসুমিতে ধান চাষ করে ছিলাম। বৃষ্টির পানিতে ধান নষ্ট হয়ে গেছে কলানো ধান বিক্রি করতে পারি নাই। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। এই মাঠই আমাদের সবকিছু, তাই আবারও মাঠে নেমেছি।দামুড়হুদা উপজেলা এলাকার কৃষক জাকারিয়া আলম বলেন, ফসল উৎপাদন করে দাম না পেয়ে দিন দিন আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। আমন ধানেও যদি কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়া যায়, তাহলে আমরা চলবো কিভাবে। একই চিত্র অন্যান্য কৃষকদেরও।চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন,এ বছর জেলায় ৩৬ হাজার ৭৮১ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকরা যেন লাভবান হতে পারেন সেজন্য ফলন বাড়াতে সার্বক্ষণিক তাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে পুরো মৌসুম চলছে। জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ ভাগ জমিতে আমন চাষ সম্পন্ন হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে আশা করছি, এবার আমন ধান চাষ করে কৃষকরা লাভবান হবেন।