চান্দিনায় মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

কুমিল্লার চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট গ্রামের কৃষিচিত্রে এখন এক নতুন রূপান্তরের হাওয়া বইছে। লালচে মাটির সমতল প্রান্তরে যেখানে বছরের এই সময়ে সাধারণ ফসলের প্রস্তুতি চলে, সেখানে রূপালী রঙের প্লাস্টিক শিটের চাদরে ঢাকা পড়েছে কৃষক মনির হোসেনের ৯০ শতাংশ জমি। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে আগাম শীতকালীন সবজি হিসেবে টমেটো চাষের এক বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছেন তিনি। আধুনিক প্রযুক্তি আর ব্যক্তিগত সাহসের ওপর ভর করে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন পুরো এলাকার কৃষকদের কৌতূহল ও সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

কৃষি উৎপাদনে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার কীভাবে একজন কৃষকের স্বপ্নকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে, ছায়কোট গ্রামের এই টমেটো ক্ষেত তার এক বাস্তব উদাহরণ। মনির হোসেন এবার তার পুরো জমির বুকেই বেছে নিয়েছেন আধুনিক মালচিং পদ্ধতি। প্রচলিত পদ্ধতিতে জমি তৈরি করে চারা রোপণ করলে যেখানে বর্ষার পানি, অনাকাঙ্খিত আগাছা এবং ক্ষতিকর পোকাণ্ডমাকড়ের আক্রমণে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়, সেখানে মালচিং পদ্ধতি এনে দিয়েছে এক কার্যকর সুরক্ষা। পুরো জমিকে নির্দিষ্ট বেডে ভাগ করে তার ওপর বিশেষ প্লাস্টিক পেপার বিছিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই প্রতিরক্ষাব্যূহ। এই পদ্ধতির প্রধান সুবিধা হলো এটি মাটির আর্দ্রতা সঠিক মাত্রায় ধরে রাখে, বাড়তি সার ধুয়ে যেতে দেয় না এবং আগাছা জন্মানোর কোনো সুযোগই রাখে না। ফলে শ্রমিক খরচ যেমন অর্ধেকে নেমে এসেছে, তেমনি গাছের সুষম বৃদ্ধিও নিশ্চিত হচ্ছে।

তবে এই প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় বৈচিত্র্য লুকিয়ে আছে এর চারা নির্বাচন এবং রোপণ শৈলীতে। সাধারণত বাজারে আগাম টমেটোর রোগের আক্রমণ ঠেকাতে গ্রাফটিং বা কলমের চারা ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়, যা যথেষ্ট ব্যয়বহুল। কিন্তু মনির হোসেন হেঁটেছেন একটু ভিন্ন পথে। তিনি গ্রাফটিং ছাড়াই সরাসরি মঙ্গল রাজ জাতের টমেটোর চারা রোপণ করেছেন। উন্নতমানের এই জাতটি এর প্রমিত আকার, চমৎকার লালচে রঙ, দীর্ঘ সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং একাধারে অধিক ফলন দেয়ার জন্য সুপরিচিত। গ্রাফটিং ছাড়া এই উচ্চফলনশীল জাতটিকে আগাম মৌসুমে টিকিয়ে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও, আধুনিক মাটির যত্ন ও সুষম পরিচর্যার মাধ্যমে সেই ঝুঁকিকে জয়ে বদলে দেয়ার চেষ্টা চলছে।

৯০ শতাংশের এক বিশাল জমিতে আধুনিক প্রক্রিয়ায় এই আগাম চাষাবাদ বেশ ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া। জমি তৈরি, মানসম্মত মঙ্গল রাজ জাতের চারা সংগ্রহ, চারপাশ ঘেরা, সার ও কীটনাশকের আগাম ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষ করে পুরো জমিতে মালচিং প্লাস্টিক স্থাপনের পেছনে মনির হোসেনকে গুণতে হয়েছে বিপুল অংকের টাকা। সব মিলিয়ে তার আনুমানিক প্রাথমিক খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। তবে এই বড় অংকের বিনিয়োগের পেছনে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী আর্থিক হিসাব। আগাম সবজি হিসেবে যখন এই টমেটো বাজারে উঠবে, তখন বাজারে শীতকালীন টমেটোর সরবরাহ থাকবে একদমই কম। ফলে সাধারণ মৌসুমের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি দামে ফসল বিক্রি করার সুযোগ তৈরি হবে, যা তার এই আড়াই লাখ টাকার বিনিয়োগকে কয়েক গুণ লাভসহ ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একজন সাধারণ কৃষকের পক্ষে এত বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ একা সফল করা বেশ কঠিন ছিল। এই পথচলায় মনির হোসেনের পাশে সার্বক্ষণিক পথপ্রদর্শক হিসেবে দাঁড়িয়েছেন চান্দিনা পৌর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সরোয়ার হোসেন। মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিত থেকে তিনি মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে শুরু করে চারা রোপণের দূরত্ব, মালচিং পেপার কাটার সঠিক নিয়ম এবং জৈব ও সুষম সার প্রয়োগের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। গ্রাফটিং ছাড়া আগাম টমেটোতে মূল পচন বা ঢলে পড়া রোগ যেন আক্রমণ করতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় বালাইনাশক ও জৈব ব্যবস্থাপনার সঠিক নির্দেশনাও দিচ্ছেন তিনি। একজন সরকারি কৃষি কর্মকর্তার এই আন্তরিক উপস্থিতি ও সঠিক দিকনির্দেশনা মনির হোসেনের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ছায়কোট গ্রামের বাতাস এখন টমেটো গাছের কচি পাতার সুবাসে ভরপুর। সবুজ চারাগুলো রূপালী প্লাস্টিকের বুক চিরে সতেজতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। আধুনিক মালচিং প্রযুক্তি, চাতুর্যপূর্ণ জাত নির্বাচন এবং স্থানীয় কৃষি বিভাগের সঠিক সমন্বয় কীভাবে প্রথাগত কৃষির চেহারা বদলে দিতে পারে, মনির হোসেনের এই জমিই তার জীবন্ত দলিল। সব কিছু পরিকল্পনা মতো চললে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই ক্ষেত ভরে উঠবে কাঁচা-পাকা টমেটোর সোনালী সম্ভাবনায়, যা কেবল মনির হোসেনের আড়াই লাখ টাকার বিনিয়োগকেই সার্থক করবে না, বরং চান্দিনা অঞ্চলের সামগ্রিক কৃষিতে এক নতুন মডেল হিসেবে অনুসৃত হবে।