চান্দিনায় কালো বেগুন চাষে লাভবান কৃষক

প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

শরতের মেঘ আর বর্ষার বর্ষণের টানাটানিতে দেশের চরাঞ্চল ও নিচু এলাকার সবজি ক্ষেত যখন পানির নিচে তলিয়ে একাকার, তখন এক টুকরো উঁচু জমি যেন রূপ নিয়েছে সম্ভাবনার সবুজ দ্বীপে। চারপাশের মাঠজুড়ে যখন চাষির হাহাকার আর নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসলের বিষাদময় ছবি, ঠিক তখনই কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে গেলে চোখে পড়বে ভিন্ন এক রূপকথা। সেই রূপকথার নায়ক কৃষক আমিন উদ্দিন, আর তার রূপালী সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে মাত্র ছয় শতাংশ জমিতে রোপণ করা কালো বেগুনের ক্ষেত।

প্রকৃতির বৈরী আচরণের কাছে কৃষক যেখানে প্রতিনিয়ত অসহায়, সেখানে দূরদর্শিতা ও সঠিক জমি নির্বাচনের মাধ্যমে কিভাবে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গড়েছেন আমিন উদ্দিন। অতিবর্ষণে যখন চান্দিনার নিচু এলাকার শাকসবজির মাঠগুলো প্লাবিত হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে, তখন নিজের উঁচু জমিতে বেগুন চাষ করার সিদ্ধান্তই তাকে আজকের সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজ পাতার ছাউনির নিচে থোকা থোকা হয়ে ঝুলে আছে গাঢ় বেগুনি রঙের রসালো কালো বেগুন। গাছের এমন সতেজতা আর গ্রোথ দেখলে যেকোনো মানুষের মন ভরে যায়। আমিন উদ্দিনের এই সফলতার পেছনের গল্পটি খুব বড় কোনো আর্থিক বিনিয়োগের নয়, বরং এটি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের ফল।

পুরো ছয় শতাংশ জমিতে বেগুন চাষ করতে তার পকেট থেকে খরচ হয়েছে মাত্র দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার মতো। সার, ওষুধ, চারা রোপণ আর সামান্য যত্নের পর এখন তিনি ফসলের মুখ দেখছেন। আর বাজারজাতকরণের এই প্রাথমিক সময়েই বাজারে শাকসবজির যে তীব্র চাহিদা এবং আকাশচুম্বী দাম, তাতে খরচের হিসেব-নিকাশ পেছনে ফেলে লাভের অংক যে বহু গুণ ছাড়িয়ে যাবে-তা তার মুখের চওড়া হাসিই বলে দেয়। বর্তমানে পাইকারি বাজারে এই গাঢ় কালো বেগুন প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা পাইকারি দরে। কাঁচাবাজারে যেকোনো সবজির দর যেখানে ঊর্ধ্বমুখী, সেখানে এক এক চালানে বেগুন তুলে বাজারে নিয়ে যাওয়া মানেই এক বুক স্বস্তি নিয়ে ঘরে ফেরা। অকাল বর্ষণে অন্যান্য জেলার সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে তরকারির চাহিদা এখন চরম শিখরে। ফলে পাইকাররা স্থানীয় বাজার থেকে আমিন উদ্দিনের বেগুন একপ্রকার কেড়াকাড়ি করেই কিনে নিচ্ছেন। ফলে তাকে আর পণ্য বিক্রি করার জন্য কোনো বিপাকে পড়তে হচ্ছে না। মেহার গ্রামের এই ইতিবাচক হাওয়া কেবল আমিন উদ্দিনের ক্ষেতেই সীমাবদ্ধ নেই। চান্দিনার বিভিন্ন ইউনিয়নের যেসব চাষি দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে নিজেদের উঁচু জমিগুলোকে বর্ষাকালীন সবজি চাষের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন, তাদের সকলের চেহারাতেই এখন একই ধরনের স্বস্তির ছাপ। অতিবর্ষণের পানি গড়িয়ে নিচে নেমে যাওয়ায় উঁচু জমিগুলোর কোনো ক্ষতি হতে পারেনি। ফলে অন্যান্য তরকারির এই সংকটের সময়ে চান্দিনার উঁচু সবজি ক্ষেতগুলো হয়ে উঠেছে গোটা এলাকার তাজা সবজির অন্যতম প্রধান জোগানদার। আমিনের এই সাফল্য এখন স্থানীয় অন্য কৃষকদের জন্যও এক অনুপ্রেরণার নাম। চিরাচরিত প্রথার বাইরে গিয়ে অল্প খরচে, স্বল্প জায়গায় এবং আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি বুঝে ফসল ফলানোর এই কৌশল দেখতে অনেকেই তার ক্ষেতে ভিড় করছেন। কৃষিকাজ যে শুধু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া কোনো খেলা নয়, বরং বুদ্ধি আর প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে কাজে লাগিয়ে অল্প পুঁজিকেও বিশাল মুনাফায় রূপান্তর করার এক লাভজনক মাধ্যম, আমিন উদ্দিনের ছয় শতাংশ জমির এই কালো বেগুন খেত আজ সেটিরই এক জীবন্ত দলিল।