বিষাক্ত ওষুধ ও খামারের দখলে বিলুপ্তির মুখে চান্দিনার দেশীয় মাছ
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
কুমিল্লার চান্দিনার গ্রামীণ জনপদে একসময় ভোরের আলো ফুটতেই খাল-বিল, পুকুর আর ডোবাগুলোতে দেখা যেত মাছ ধরার আনন্দঘন দৃশ্য। জাল, পলো কিংবা খালি হাতেই ধরা পড়ত কৈ, শিং, মাগুর, টেংরা, পাবদা, বাইম, পুটি, খলসে আর চিতলের মতো নানা পদের দেশীয় মাছ। চান্দিনার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো ছিল এসব সুস্বাদু মাছের অভয়ারণ্য। তবে কালের বিবর্তনে এবং মানবসৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ডের কারণে সেই পরিচিত দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত। চান্দিনার জলাশয়গুলো থেকে আশঙ্কাজনক হারে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ, যা আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এসে ঠেকেছে।
এই পরিবর্তনের মূল নেপথ্যে রয়েছে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের ব্যাপক প্রসার। গত কয়েক দশকে চান্দিনায় মাছ চাষির সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। লাভজনক হওয়ায় অধিকাংশ চাষি তাদের সুবিধাজনক ও পছন্দসই পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, রুই বা কার্প জাতীয় চাষের মাছের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। আগে যেসব খোলা খাল, বিল বা নিচু জমিতে প্রাকৃতিকভাবে দেশীয় মাছ প্রজনন করত এবং বেড়ে উঠত, সেসব জলাশয় এখন কাটাবোঝাই করে ঘের ও বাণিজ্যিক মাছের খামারে রূপান্তর করা হয়েছে। প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যগুলো এভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন খামারে পরিণত হওয়ায় দেশীয় মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
মাছ চাষের এই আধুনিক প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে রাসায়নিক ওষুধ ও বিষের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে। চান্দিনার খামারগুলোতে নতুন করে বাণিজ্যিক মাছের রেনু বা পোনা ছাড়ার আগে এক ধরনের চরম ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। চাষীরা তাদের পছন্দমতো মাছের কোনো রোগবালাই যেন না হয় এবং খামারের প্রজাতিগুলো যেন দ্রুত বাড়ে, সেজন্য জলাশয়ে ব্যাপক হারে নানা ধরনের রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগ করেন। খামার তৈরির শুরুতে প্রয়োগ করা এসব ওষুধ ও বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা স্থানীয় দেশীয় মাছ ও তাদের ডিম মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে যে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে চাষের মাছকে সুরক্ষার জন্য, সেই ওষুধই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশীয় প্রজাতির টিকে থাকার পথে। আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এই অনিয়ম থামছে না। সরকারিভাবে বিভিন্ন পুকুর, খাল বা জলাশয়ে বিষ কিংবা ক্ষতিকারক ওষুধ প্রয়োগ করে মাছ মারা বা জলাশয় পরিশোধনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু চান্দিনার অনেক চাষি স্থানীয় আইন ও পরিবেশগত নির্দেশনার তোয়াক্কা না করেই অহরহ এই বিষ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। সরকারি তদারকির অভাব এবং অসাধু উপায়ে দ্রুত মুনাফা লাভের আশায় প্রতিনিয়ত জলাশয়গুলোতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিষাক্ত দ্রব্য মেশানো হচ্ছে। এর ফলে শুধু যে দেশীয় মাছই মারা যাচ্ছে তা নয়, বরং পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং জলজ বাস্তুসংস্থান মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
দেশীয় প্রজাতির এসব মাছ কেবল আমাদের খাদ্যাভ্যাস বা স্বাদের অংশ ছিল না, বরং এগুলো গ্রামীণ ঐতিহ্য ও পুষ্টির এক সহজলভ্য উৎস ছিল। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এই মুক্ত জলাশয়ের মাছগুলো যুগ যুগ ধরে বড় ভূমিকা রেখে এসেছে। কিন্তু আজ বাজারগুলোতে দেশীয় মাছের দেখা পাওয়া ভার, আর যা-ও দু-একটি পাওয়া যায়, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। সরকারিভাবে কঠোর আইন প্রয়োগ, বিষ ও অনিয়ন্ত্রিত ওষুধের ব্যবহার রোধ এবং বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছের জন্য নিরাপদ অভয়ারণ্য তৈরি করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে চান্দিনার বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে আমাদের এই প্রিয় মাছগুলো।
