দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরাবাসীর একমাত্র ভরসা 'ভাসমান ক্লিনিক'

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি

নদীর ওপর চিকিৎসা| কিন্তু সেখানে পৌঁছানোই যেন আরেক যুদ্ধ| কাঁচা রাস্তা, নদী-খাল, দুর্বল যোগাযোগ আর বারবার আঘাত হানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা পাওয়া দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ| বিশেষ করে নারী, শিশু ও অসচ্ছল মানুষের জন্য এই সংকট আরও তীব্র| উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরের দ্বীপ ইউনিয়নে বছরের বিভিন্ন সময়ে দুর্যোগ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়| চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও অনেক সময় দ্রুত চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না|

এমন পরিস্থিতির মধ্যে মানুষের কাছে চিকিৎসাসেবা নিয়ে যাচ্ছে একটি ট্রলার| জল ও স্থলে পরিচালিত এই উদ্যোগে গাবুরার মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠছে ব্রতী সমাজ কল্যাণ সংস্থার ভাসমান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র|নর্থ আমেরিকান বাংলাদেশি ইসলামিক কমিউনিটি (নাবিক)-এর অর্থসহায়তায় 'মহিউদ্দিন নূর রাশিদা সেন্টার' নামে পরিচালিত হচ্ছে এই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম| স্থলভাগে চার শয্যার একটি ক্লিনিকের পাশাপাশি ভাসমান চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে একটি ট্রলার| এর মাধ্যমে দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা| গাবুরার স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে নারী ও শিশু|

মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি থাকায় গর্ভবতী নারীদের বড় একটি অংশ এখনও ধাত্রীনির্ভর| ব্রতীর গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রশিক্ষণের অভাব, অনিরাপদ প্রসব পদ্ধতি ও অপচিকিৎসার কারণে নারী ও শিশুদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে|এই বাস্তবতায় শুধু রোগী দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না ব্রতীর কার্যক্রম| স্থানীয় ধাত্রীদের আধুনিক ও নিরাপদ প্রসবসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে| স্বাস্থ্য সহায়কদেরও দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ|

জটিল রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে| ব্রতীর শ্যামনগর অফিসের কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি স্থানীয় ধাত্রীদের নিরাপদ প্রসবসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসহায়কদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে| কোনো রোগীর অবস্থা জটিল হলে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়| গাবুরার মানুষের জন্য নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে এমবিবিএস চিকিৎসকের উপস্থিতিতে বিনা মূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প| রয়েছে গাইনি ক্যাম্প, অনলাইন চিকিৎসাসেবা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য থেরাপি ক্যাম্প| অসচ্ছল রোগীদের বিনা মূল্যে ওষুধও দেওয়া হচ্ছে| একই সাথে বিভিন্ন ধরনের প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে| রক্ত পরীক্ষা, ব্লাড সুগার ও হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা, নেবুলাইজার এবং অক্সিজেন সেবা দেওয়া হচ্ছে| প্রতি মাসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আটটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প| এই কার্যক্রমে সেবাদানে নিয়োজিত রয়েছেন একজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও তিনজন ফ্যাসিলিটেটর| প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের উপস্থিতিতে ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়| ব্রতীর উদ্যোগে এর আগেও জলপথে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল| ২০২০ সালে খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সভিত্তিক ভাসমান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালুর তথ্যও পাওয়া যায়|

গাবুরায় ব্রতীর কার্যক্রম শুধু স্বাস্থ্যসেবায় আটকে নেই| দীর্ঘমেয়াদি শিশু সুরক্ষার অংশ হিসেবে ৪০০ শিশুর পুনর্বাসন করা হয়েছে| গৃহহীন পরিবারকে গৃহনির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে| রয়েছে সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং দুর্যোগকালীন ত্রাণ|মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বিনামূল্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও পরিচালনা করছে সংস্থাটি| ফলে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা, পানি ও দুর্যোগ মোকাবিলায়ও সহায়তা পাচ্ছে দুর্গম এই জনপদের মানুষ| গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলম বলেন, ব্রতী সমাজ কল্যাণ সংস্থা চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি শিক্ষা, অর্থসহায়তা, সুপেয় পানি সংরক্ষণের জন্য ড্রাম বিতরণ ও খাদ্য সহায়তা দিয়ে আসছে| এসব উদ্যোগ দ্বীপবাসীর জন্য অত্যন্ত সহায়ক|তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসক এসে ক্যাম্পের মাধ্যমে মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন| গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও শিক্ষক খায়রুল ইসলাম মিলন বলেন, ব্রতী জল ও স্থলে ক্যাম্পের মাধ্যমে এখানকার মানুষকে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে| স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়েও গাবুরায় বিভিন্ন সংগঠনের স্বাস্থ্য কার্যক্রম দেখা গেছে|

চলতি বছরের জুনে গাবুরার ১৫ জন স্বাস্থ্য স্বেচ্ছাসেবককে স্বাস্থ্যবিষয়ক উপকরণ দেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে| গাবুরার মতো এলাকায় চিকিৎসাসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া কেবল একটি স্বাস্থ্য কার্যক্রমে এটি যোগাযোগ ও দুর্যোগের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ|

বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা অতিবৃষ্টির সময়ে যখন স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হয়, তখন স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসার সুযোগ থাকা মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে|প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন দারিদ্র?্য ও যোগাযোগ সংকটের মধ্যে বসবাস করা দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরাবাসীর জন্য চিকিৎসা পাওয়া অনেক সময়ই কঠিন| সেখানে রোগীকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসাকেই রোগীর কাছে নিয়ে যাওয়ার এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করছে| গাবুরার মানুষের প্রত্যাশা, এমন কার্যক্রম নিয়মিত ও আরও বিস্তৃত হলে দুর্গমতার কারণে চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা কমবে| জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্যের সথে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই দ্বীপ জনপদে তাই ভাসমান স্বাস্থ্যসেবা শুধু অনেকের কাছে এটি হয়ে উঠেছে চিকিৎসার ভরসা|