পাবনায় স্বাস্থ্য বিভাগে জনবল সংকট
১৫৫টি চিকিৎসকের পদশূন্য
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
কাজী বাবলা, পাবনা

পাবনায় স্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে তীব্র জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা সদরসহ নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৩২৪টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১৬৯ জন। ১৫৫টি চিকিৎসকের পদই শূন্য রয়েছে। ফলে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে তীব্র জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংকট অ্যানেসথেশিয়া কনসালটেন্টের। জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে কেবল আটঘরিয়া ও বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেসথেশিয়া কনসালটেন্ট রয়েছেন। বাকি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক দিয়েই সেবা কার্যক্রম চলছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাবনার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট শয্যা রয়েছে ৪০১টি। তবে এর বিপরীতে বর্তমানে গড়ে প্রায় ৭৬০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। অর্থাৎ অনুমোদিত শয্যার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় হাসপাতালগুলোতে মারাত্মক বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সুজানগর উপজেলা ও পাবনা সদর ছাড়া জেলার বাকি সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালু রয়েছে। এসব হাসপাতালে অন্যান্য অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি মূলত সিজারিয়ান অপারেশনই বেশি হয়। তবে পাবনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে কোনো শয্যা না থাকায় সেখানে রোগী ভর্তি কিংবা অস্ত্রোপচারের সুবিধা নেই। প্রতিষ্ঠানটি মূলত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো তদারকি করে থাকে। হাসপাতালগুলোতে প্যাথলজি বিভাগ চালু থাকলেও এবং ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও কোনো উপজেলাতেই প্যাথলজিস্ট নেই। বাধ্য হয়ে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের দিয়েই এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চালানো হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, জেলার সবকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই আল্ট্রাসনোগ্রাম ও এক্স-রে মেশিন সচল রয়েছে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে নিয়মিত রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। স্বল্প খরচে এসব সেবা পাওয়ায় প্রান্তিক জনগণ উপকৃত হচ্ছেন।
চিকিৎসকের পাশাপাশি অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদেও সংকট রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অনুমোদিত পদ রয়েছে ১ হাজার ৭২০টি, যার বিপরীতে কর্মরত আছেন ১ হাজার ২৬২ জন। ৮৮টি পদ পুরোপুরি খালি থাকলেও দ্রুত ৭৪ জনকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কর্মীদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে এই ব্যবস্থায় কেউ কর্মরত নেই। তবে নতুন করে আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
জনবল সংকটের কারণে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসকের সংকট থাকায় সীমিতসংখ্যক চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করেই অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিকুল ইসলাম শামীম বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকটে সেবা দিতে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে প্রান্তিক জনগণ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে দরিদ্র মানুষ ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, ফলে রোগও সহজে সারছে না এবং মানুষ তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে হলে দ্রুত জনবল সংকট দূর করা জরুরি।
সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহিমা খাতুন বলেন, ছুটিতে বাড়ি এসে হঠাৎ মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসি। কিন্তু গিয়ে দেখি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নেই। বাধ্য হয়ে মাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই, কিন্তু সেখানেও একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। এভাবে চলতে থাকলে দেশের মানুষ কীভাবে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে?
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর পাবনা জেলা শাখার সদস্য সচিব ডা. আহমেদ মোস্তফা নোমান বলেন, পাবনার বর্তমান স্বাস্থ্যসেবার চিত্র অত্যন্ত নাজুক। মূলত সঠিক তদারকির অভাবেই পরিস্থিতির এই অবক্ষয় ঘটেছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে দ্রুত চিকিৎসকসহ শূন্য পদগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া দরকার। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সিভিল সার্জন আবুল কালাম আজাদ বলেন, জেলার বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকট বিদ্যমান। তবে শূন্য পদগুলো পূরণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হলে এই সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। তিনি আরো বলেন, বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মী নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা গেলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি রোগীদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা পাওয়াকে আরও সহজ ও কার্যকর করবে।
