জমি-গরু বিক্রি করে এলাকাবাসীর জন্য বিএনপি নেতার রাস্তা নির্মাণ
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রায়পুর (লক্ষ্ণীপুর) প্রতিনিধি

লক্ষ্ণীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের পানির ঘাট থেকে ধানুর খেওয়া ঘাট পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার মাটির রাস্তা নির্মাণ করে দিয়েছেন স্থানীয় কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সিদ্দিক সরকার। দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ সংকটে থাকা চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাস্তাটি নির্মাণ করেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, রাস্তা নির্মাণের শুরুতে এলাকার মানুষজন সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭৫ হাজার টাকা দিতে পেরেছেন। বিপরীতে প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ রাস্তায় বড় অংশের অর্থ দিয়েছেন সিদ্দিক সরকার। স্থানীয়দের ভাষ্য, নিজের জমি ও গরু বিক্রি করেই তিনি এ কাজে অর্থ জোগান দিয়েছেন। এলাকাবাসী জানান, আগে পানির ঘাট থেকে ধানুর খেওয়া ঘাট পর্যন্ত চলাচলের জন্য কোনো রাস্তা ছিল না। বর্ষাকালে পুরো এলাকা কাদা-পানিতে ডুবে যেত। নারী, শিশু, বয়স্ক মানুষ ও কৃষকদের হাঁটুসমান পানি ও কাদার মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হতো। অনেক সময় জুতা হাতে নিয়ে কাদা-পানি পেরিয়ে যেতে হতো। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তেন কৃষকেরা। উৎপাদিত ফসল বাড়িতে নেওয়া কিংবা বাজারে নিয়ে বিক্রি করা ছিল তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, প্রথমে এলাকার সবাই বলেছিল, যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, সবাই কিছু কিছু টাকা দেব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। অথচ রাস্তা করতে খরচ হয়েছে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বড় অংশের টাকা সিদ্দিক সরকার দিয়েছেন। তার সহযোগিতা ছাড়া এই রাস্তা আমাদের জন্য স্বপ্নই থেকে যেত।
আরেক বাসিন্দা বলেন, আগে এই চর দিয়ে হাঁটতে আমাদের অনেক কষ্ট হতো। বর্ষার সময় কাদা-পানির মধ্যে দিয়ে, অনেক সময় জুতা হাতে নিয়ে চলতে হয়েছে। এখন রাস্তা হওয়ায় চলাচলে অনেক সুবিধা হয়েছে। তবে আমরা চাই, সরকার দ্রুত রাস্তাটি পাকা করে দিক। চরের এক নারী বলেন, আগে বৃষ্টি হলে ঘর থেকে বের হওয়াই কঠিন ছিল। নারী ও শিশুদের নিয়ে চলাচলে অনেক সমস্যা হতো। এখন রাস্তা হওয়ায় আমরা অনেকটা স্বস্তি পেয়েছি। রাস্তাটি পাকা হলে আমাদের কষ্ট আরও কমবে। এক কৃষক বলেন, চরে প্রায় কয়েক হাজার একর জমিতে আমরা ফসল করি। কিন্তু ফসল বাড়িতে আনা বা বাজারে নেওয়ার জন্য কোনো রাস্তা ছিল না।
আমাদের জন্য সরকারি কোনো ব্যবস্থা হয়নি। সিদ্দিক সরকার নিজের জায়গা-জমি ও গরু বিক্রি করে মানুষের জন্য রাস্তা করেছেন। এখন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, রাস্তাটি পাকা করে দেওয়া হোক।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তা নির্মাণ করলেও সিদ্দিক সরকারের নিজের বসতঘরের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। ভাঙা বেড়া, মাটির উঠান ও সাধারণ জীবনযাপনের চিত্র দেখা যায় তার বাড়িতে। এলাকাবাসীর দাবি, মানুষের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে তিনি নিজের সম্পদ ব্যয় করেছেন। এ বিষয়ে কৃষকদল নেতা সিদ্দিক সরকার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানুষের দাবি ছিল, এই রাস্তাটি করে দেওয়া। কিন্তু আমি নেতাদের কাছে এবং ইউনিয়ন পরিষদে কয়েকবার যোগাযোগ করেও এক মুঠো মাটিও আনতে পারিনি। চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট আমি কাছ থেকে দেখেছি। বর্ষার সময় কাদা-পানি পেরিয়ে মানুষ চলাচল করতেন, কৃষকেরা ফসল নিয়ে বাড়ি ফিরতে অনেক ভোগান্তিতে পড়তেন। আমি যেহেতু শহিদ জিয়ার আদর্শের কৃষকদল করি, তাই এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তা করার উদ্যোগ নিই।
তিনি আরও বলেন, সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী কেউ টাকা দিতে পারেননি। তাই নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে আমি খুশি। তবে এটি মাটির রাস্তা।
স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের কাছে রাস্তাটি পাকাকরণের দাবি জানাই। স্থানীয়দের মতে, চরাঞ্চলের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। প্রতিবছর এখানে বিপুল পরিমাণ ফসল উৎপাদন হলেও যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে কৃষকদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে কাঁচা রাস্তা দিয়ে কৃষিপণ্য পরিবহন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
