আড়াই মণ ধানে মিলছে এক কেজি ইলিশ
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
পাথরঘাটা (বরগুনা) প্রতিনিধি

বঙ্গোপসাগরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিন-রাত মাছ ধরেন জেলেরা। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, উত্তাল ঢেউ ও জলদস্যুদের আতঙ্ক উপেক্ষা করে কখনো শত শত, আবার কখনো হাজার হাজার ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফেরেন তারা। অথচ সেই ইলিশই তাঁদের পরিবারের পাতে ওঠে না। দাদন, কিস্তি ও ঋণের বোঝায় জর্জরিত এসব জেলের কাছে ইলিশ এখন যেন 'ধরার মাছ, খাওয়ার নয়'। ইলিশের ভরা মৌসুমেও এমন বাস্তবতা বিরাজ করছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণকেন্দ্র পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য বাজারে। বর্তমানে সেখানে এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার টাকায়। কখনও কখনও দাম আরও বেড়ে যায়। ফলে সাগর থেকে ইলিশ ধরে আনলেও বাজারে বিক্রি করে সংসারের খরচ, দাদন ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হয় জেলেদের।
পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের জিনতলা গ্রামের জেলে কালাম সরদার বলেন, সাগরে মণে মণে ইলিশ মাছ ধরি। কিন্তু দাদন, কিস্তি আর ঋণের কথা মনে পড়লেই আর মাছ খেতে পারি না। আমরা শুধু মাছ ধরি, কিন্তু খেতে পারি না।
তিনি বলেন, যখন এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ হাতে পাই, তখন মাছটির দিকে তাকিয়ে চিন্তা করি- এটি বিক্রি করলে আড়াই মণ ধান কেনা যাবে। তখন আর মাছ খাওয়ার কথা মনে থাকে না। পরিবারের কথা চিন্তা করে মাছটি বিক্রি করে দিতে হয়।
এফবি তারেক ট্রলারের মাঝি রফিক মিয়া বলেন, একটি ইলিশের পেছনে তাদের দীর্ঘ শ্রম ও জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে কখনো ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, কখনো উত্তাল ঢেউ, আবার কখনো জলদস্যুদের হামলার আশঙ্কা নিয়ে সাগরে থাকতে হয়। অনেক সময় দুর্ঘটনায় প্রাণও হারান জেলেরা। জেলেদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের আরেকটি ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে। মাছ ধরতে গিয়ে উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে এফবি বরকত নামের একটি ট্রলার ডুবে যায়। ট্রলারে থাকা ১৩ জেলের মধ্যে অন্য একটি ট্রলারের সহায়তায় ভাসমান অবস্থায় আটজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরে নিখোঁজ পাঁচ জেলের মধ্যে একজনের লাশ উদ্ধার করা হলেও বাকি চারজনের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। ট্রলারটিরও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্বজন ও জেলেদের আশঙ্কা, নিখোঁজ চার জেলের সলিলসমাধি হয়েছে ট্রলারের ভেতরেই। উপকূলের জেলেদের কাছে এমন দুর্ঘটনা নতুন নয়। জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত তাঁদের পাড়ি দিতে হয় উত্তাল বঙ্গোপসাগর। কখনও বৈরী আবহাওয়া, কখনও যান্ত্রিক ত্রুটি, আবার কখনও জলদস্যুদের আতঙ্ক-সবকিছুকে সঙ্গী করেই তাদের সমুদ্রে যেতে হয়। অন্যদিকে, সাগর থেকে ধরা ইলিশের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। পাথরঘাটা খুচরা মাছ বাজারে কথা হয় কৃষক গনি মিয়ার (৫৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, 'এক কেজি সাইজের একটি ইলিশ কিনতে হলে আমাকে আড়াই মণ ধান বিক্রি করতে হবে। সেই কথা চিন্তা করলে মাছ কেনা হয় না। শুধু দুই চোখে দেখি, কখনও দামও জিজ্ঞেস করি না। যেটা কিনতে পারব না, সেটার দাম জিজ্ঞেস করে লাভ কী? কবে খেয়েছি ইলিশ মাছ, সেই স্বাদও এখন মনে নেই। জেলেদের ভাষ্য, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর থেকে মাছ ধরে আনলেও সেই মাছের ন্যায্য মূল্য ও নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। আড়তদার ও মহাজনের দাদন, বিভিন্ন ঋণের কিস্তি, ট্রলারের জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ এবং সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে মাছ বিক্রি করে দিতে হয়। ফলে ইলিশের ভরা মৌসুমেও তাদের ঘরে ইলিশের স্বাদ জোটে না। বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মো. দুলাল মাস্টার বলেন, পাথরঘাটার বহু জেলে শ্রমিকের আক্ষেপ- যে মাছ ধরতে গিয়ে তাঁদের জীবন দিতে হয়, সেই মাছই পরিবারের সবাই মিলে খাওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই।
তিনি বলেন,জেলেদের কাছে ইলিশ এখন শুধু মাছ নয়; এটি তাঁদের জীবিকার প্রতীক। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, ঋণ আর অনিশ্চয়তার নির্মম বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।
ইলিশ দেশের মানুষের কাছে জাতীয় মাছ হলেও এর উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জেলেদের অনেকের কাছেই তা এখন বিলাসী খাবারে পরিণত হয়েছে। সাগরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে জেলে হাজার হাজার ইলিশ ধরে ঘাটে ফেরেন, ঋণের বোঝা আর সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে সেই জেলেকেই শেষ পর্যন্ত নিজ হাতে ধরা ইলিশ বিক্রি করে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়।
