চান্দিনায় পরিত্যক্ত জমিতে বাড়ছে হলুদের আবাদ

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওসমান গনি, চান্দিনা (কুমিল্লা)

একসময় যেসব জমি পড়ে থাকত একদম অযত্ন আর অবহেলায়, সেখানে আজ সোনালি স্বপ্নের বুনন। কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার গ্রামগুলোতে চোখ মেলালেই এখন দেখা মেলে এমন মনোরম দৃশ্য। বসতবাড়ির আঙিনা, পেছনের অনাবাদী ভিটে কিংবা ছায়াঘেরা পরিত্যক্ত স্থানগুলো আর ফেলে রাখা হচ্ছে না। সেখানে দোলা দিচ্ছে বাণিজ্যিক ও পারিবারিক চাহিদার হলুদ গাছ। চাষীদের পরিশ্রমে পরিত্যক্ত জমিতে এখন একফালি নতুন সম্ভাবনার সূর্য উঠেছে, যা একদিকে যেমন অনাবাদী জমির সেরা ব্যবহার নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে মেটাচ্ছে পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা।

চান্দিনার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, আবহমান গ্রামবাংলার চেনা রূপের পাশে যুক্ত হয়েছে নতুন রঙের ছোঁয়া। এলাকার অনেক কৃষক ও গৃহস্থ তাদের বসতবাড়ির আশপাশের অব্যবহৃত স্থানগুলোকে কাজে লাগাতে উদ্যোগী হয়েছেন। যেসব জমিতে আগে কখনো কোনো ফসল ফলেনি, কেবল আগাছা আর জঙ্গল গজিয়ে থাকত, সেসব জায়গা পরিষ্কার করে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হলুদের কন্দ। ছায়াঘেরা ভেজা মাটিতে অন্য ফসল ভালো না হলেও মসলাজাতীয় এই ফসলটি চমৎকার বাড়ে। ফলে যেসব জায়গা নিয়ে কৃষকের কোনো প্রত্যাশা ছিল না, সেই জায়গাই এখন সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ ধরনের অনাবাদী জমিতে হলুদ চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অতিরিক্ত যত্ন বা মোটা অঙ্কের মূলধনের প্রয়োজন হয় না। সাধারণত বসতবাড়ির পাশে বড় গাছের ছায়া পড়ে এমন স্থানে আলোর অভাবে প্রচলিত দানাশস্য বা শাকসবজি ফলানো কষ্টকর। তবে হলুদ একটি ছায়াসহিষ্ণু ফসল হওয়ায় গাছের ছায়ার নিচেও এর ফলন ব্যাহত হয় না। তাছাড়া পশুপাখির উপদ্রব কম থাকা এবং পরিচর্যা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় গ্রামীণ নারী ও গৃহস্থরা অত্যন্ত উৎসাহের সাথে এই হলুদ চাষে এগিয়ে এসেছেন। অনেকে নিজেদের পরিবারের বার্ষিক হলুদের চাহিদা মেটাতে ছোট জায়গায় এই চাষ শুরু করলেও, এখন পর্যাপ্ত উৎপাদন দেখে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির আশাও করছেন। বর্তমানে নিত্যপণ্যের বাজারে মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বেশ চড়া। এমন পরিস্থিতিতে নিজ বাড়িতে উৎপাদিত খাঁটি ও ভেজালমুক্ত হলুদ পাওয়া পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি আর্থিক সাশ্রয়ও ঘটাচ্ছে। চান্দিনার কৃষকরা বলছেন, বাজার থেকে রাসায়নিক মেশানো হলুদ কেনার চেয়ে নিজেদের আঙিনায় প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত হলুদের প্রক্রিয়াজাতকরণ অনেক বেশি নিরাপদ। এর ফলে গ্রামীণ জনপদে নিজেদের স্বাবলম্বী করার এক নতুন সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, অনাবাদী জমিকে চাষের আওতায় আনার এই দেশীয় পদ্ধতি সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদী না থাকে—এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন চান্দিনার প্রামীণ কৃষকরা। বসতবাড়ির অব্যবহৃত কোণ থেকে শুরু করে ছায়াঘেরা পরিত্যক্ত ভিটে পর্যন্ত সর্বত্র আজ রূপালী মাটির বুক চিরে সোনালী কন্দ গজিয়ে উঠছে। সামান্য ইচ্ছা আর সামান্য শ্রমেই যে বছরের পারিবারিক মসলার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব, তা চান্দিনার এই সফল উদ্যোগ প্রমাণ করে দিয়েছে। সঠিক নির্দেশনা ও সামান্য উৎসাহ পেলে এই ক্ষুদ্র প্রয়াসই ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক রূপ নেবে এবং চান্দিনাকে স্থানীয় মসলা উৎপাদনে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরবে।