রংপুর অঞ্চলে বেপরোয়া হয়ে উঠছে 'কিশোর গ্যাং'

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রংপুর ব্যুরো

রংপুর অঞ্চলে দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে মাদক। এই মাদকের থাবায় ধ্বংস হচ্ছে যুব সমাজ। আর সেই মাদকের টাকা জোগাড়ে বাড়ছে, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি। এমনকি হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটছে। এতে করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে রংপুরবাসী। জানা যায়, মাদকের বড় চালান বৃহত্তর রংপুরের লালমিনরহাট-কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্ত এলাকা থেকে ফেন্সিডিল, ইয়াবা, হেরোইনসহ নেশা জাতীয় ড্রাগস অবৈধভাবে আসছে। জানা যায়, রংপুর নগরীর বৈরাগীপাড়া, দাসপাড়া-মাছুয়াপাড়া, তাঁতিপাড়া, রবার্টসনগঞ্জ, স্টেশন-কলোনী, বাবুপাড়া, খেরপাড়া, হনুমান তলা, নিউ জুম্মাপাড়ার সুইপার কলোনী, টার্মিনাল, সিও বাজার, মুলাটোলসহ জেলার গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, কাউনিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেদারছে চলছে মাদকের কারবার। অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশ লাইনের পাশেই টাউন হল চত্বর, জুলাই চত্বর, ডিবি কার্যালয়ের ১'শ গজের ভেতরে মাদকসেবীদের আড্ডা দেখা যায়। মাদকে জড়িয়ে পড়েছে স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরাও। মাদকের কড়াল গ্রাসে পড়ে নষ্ট হচ্ছে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত প্রজন্ম। গড়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। বস্তি এলাকা থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকাগুলোতে মাদকসেবনের অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে।

একাধিক ব্যক্তির অভিযোগে জানা যায়, রংপুরে লাইসেন্সের অপব্যবহার করে বৈধ বিক্রয় কেন্দ্রে অবৈধ দেশি মদের রমরমা ব্যবসা করা হচ্ছে। বরাদ্দের দ্বিগুণ মদ অবৈধ পন্থায় সংগ্রহ করে বিক্রি করা হচ্ছে। মাদক পরিবহনে শিশু কিশোরদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত মদের পরিমান ও ক্রেতার সংখ্যা কোনটাই মানছে না নামধারী বৈধ ব্যবসায়ীরা। ফলে সামাজিক নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা যাচ্ছেনা। বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। রংপুর বিভাগীয় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানাগেছে, রংপুরে তিনটি বৈধ মদ বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। এগুলো হচ্ছে রংপুর সদর, বদরগঞ্জ ও কউনিয়া উপজেলা। এছাড়া কুড়িগ্রামে দুইটি, লালমনিরহাটে দুইটি, নীলফামারীতে ৩ টি, পঞ্চগড়ে একটি ও দিনাজপুরে ৪টি বৈধ মদ বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে কেরু এন্ড কোম্পানি উৎপাদিত দুই ধরনের মদ বিক্রির অনুমতি রয়েছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমান মদ লাইসেন্সধারী ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করার নিয়ম। নিয়ম না মেনে নির্দিষ্ট পরিমানের কয়েকগুণ বেশি মদ বিভিন্ন পন্থায় সংগ্রহ করে বিক্রি করা হচ্ছে। লাইসেন্সধারীদের কাছে মদ বিক্রির বাধ্যবাধকতা থাকলেও লইসেন্স ছাড়াও অবাধে মদ সেবন ও বিক্রি হচ্ছে। এসব বিষয় ওপেন সিক্রেট। সম্প্রতি রংপুরের কাউনিয়ায় সরকার অনুমোদিত একটি দেশি মদের বিক্রয়কেন্দ্র মদ বিক্রি ও সেবনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওর সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে সেখানে ৮-১০ বছর বয়সী শিশু মদের পাত্র বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। একাধিক ব্যক্তি প্রকাশ্যে বসে মদ খাচ্ছে। ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকাজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে স্থানীয় লোকজন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছেও দেশি মদ বিক্রি করছে।

কাউনিয়া কেন্দ্রের মদ বিক্রেতা রতন সরকার বলেন, আমি লাইসেন্স ছাড়া মদ বিক্রি করি না। ভিডিওর মদ খাওয়ার বিষয়টি সুইপারদের। পাত্রে করে মদ নিয়ে যাওয়ার শিশুটিও সুইপারের ছেলে। সুইপাররা জন্মের পর থেকেই মদ খায়। ওদের বাধা দেয়া যায় না।

রংপুর বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মাসুদ হোসেন বলেন, কাউনিয়ায় মদ বিক্রি, সেবন ও শিশু দিয়ে পরিবহন করা প্রসঙ্গে বলেন, ভিডিওটি আমাদের কাছে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান আগস্ট মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে ৬৩৫ গ্রেপ্তার করা হয়েছে । মাদকের বিরুদ্ধে রংপুর রেঞ্জ পুলিশের চলমান অভিযানে আগস্ট মাসে আট জেলায় মোট ৪৯৭টি মাদক মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব মামলায় ৬৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানকালে উদ্ধার করা হয়েছে ২২২.৫ কেজি গাঁজা, ১২১ বোতল ফেনসিডিল, ২১,৫১৪ পিস ইয়াবা এবং ২৭ গ্রাম হেরোইন। তিনি বলেন মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, বিক্রেতা ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।