চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৪ মাসে ৫৫০ জনের আত্মহত্যা

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আত্মহত্যার ঘটনা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জেলায় গত ২৪ মাসে গলায় ফাঁস দিয়ে ও বিষপানে ৫৫০ জন আত্মহত্যা করেছেন এবং গত ১৭ মাসে ১ হাজার ৬৮৫ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে এই চিত্র উঠে এসেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ২৯৪ জন এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২৫৬ জন গলায় ফাঁস ও বিষপান করে আত্মহত্যা করেছেন। এসব ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ৬০৪ জন (৩৫৮ নারী ও ২৪৬ পুরুষ) আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এর আগের বছর (২০২৫ সালে) ১ হাজার ৮১ জন নারী-পুরুষ (৬৩৯ নারী ও ৪৪২ পুরুষ) আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। গত বছর ও চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার মধ্যে রয়েছে— গত ৪ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জে পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীকে ধারালো হাসুয়া দিয়ে কুপিয়ে হত্যার পর স্বামী মফিজুল হক (৭৫) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ২৪ জুন পৌর এলাকার টিকরামপুরে ফারহানা আসিক কলি (২৬) ও ৯ জুন সুন্দরপুর ইউনিয়নে ইয়াসমিন (২৪) গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। এছাড়া মোবাইল ফোন কিনে না দেওয়ায় সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গার চকঝগড়ু গ্রামে আব্দুল করিম নামে এক কিশোর অভিমানে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এমন আরও ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ, পারিবারিককলহ, বিষণ্ণতা, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, অভাব-অনটন, বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক, প্রেমের সম্পর্কের বিচ্ছেদ এবং অভিমানে সববয়সি মানুষ এই পথ বেছে নিচ্ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীরা।

নামোশংবাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসলাম কবীর বলেন, পড়াশোনার অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের অতিমাত্রায় চাওয়া কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়াচ্ছে। বয়সসন্ধিকালের মানসিক টানাপড়নে অভিভাবকদের সন্তানদের পাশে থেকে বন্ধুসুলভ আচরণ করার তাগিদ দেন তিনি। জেলায় প্রতি মাসে আশঙ্কাজনক হারে মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল উপজেলা শিবগঞ্জে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১০০ জন নতুন মানসিক রোগী চিহ্নিত হচ্ছে। এছাড়া গোমস্তাপুরে ৬০-৭০ জন, নাচোলে ৪০ জন এবং ভোলাহাটে ৮-১০ জন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রাম'-এর আওতায় জেলায় ১৩০ জন চিকিৎসক ও ৪০ জন নার্সকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, নিয়মিত বদলির কারণে বর্তমানে মাঠপর্যায়ে তীব্র চিকিৎসক সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে এই শূন্যতা দূর করনে নতুন চিকিৎসকদের শিগগির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এদিকে চিকিৎসক-নার্সদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১২২ জন শিক্ষককে এই বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। এই শিক্ষকরা নিজ নিজ বিদ্যালয়ের দুই হাজার শিক্ষার্থীকে মানসিক স্বাস্থ্য ও এই বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করেছেন। আগামীতে আরও তিন হাজার শিক্ষার্থীকে এই বিষয়ে অবগত করা হবে। শিক্ষার্থীদের এই সচেতনতার আওতায় আনা সম্ভব হলে কর্মসূচিটি আরও সফল হবে।

আত্মহত্যার প্রতিরোধে সচেতনতার কোন বিকল্প নেই উল্লেখ করে শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. শাহীন কাউসার বলেন, 'যখন কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সে নিজেকে কোন ঘটনার জন্য দায়ী মনে করে। সে নিজে এবং অন্যকে সেখান থেকে সরাতে আত্মহত্যা করে সে। যখন কেউ আত্মহত্যা করে তখন তার থেকে কিছু লক্ষণ পাওয়া যায়। এসব লক্ষণ আত্মহত্যার করার ৩-৬ মাস আগ থেকে প্রকাশ পায়। যেমন নিজের ক্ষতি করার ইচ্ছা, বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে না পাওয়া এরকম শব্দ প্রায় ব্যবহার করবে। বেঁচে থাকার ভালো না লাগার কারণগুলো আচরণ প্রকাশ করবে।তার মধ্যে প্রস্তুতিমূলক লক্ষণ পাওয়া যাবে। এ সময় প্রিয়জনদের কাছে হঠাৎ করে ক্ষমা চাওয়া এবং বিদায় নেওয়ার মতো আচরণ করা।

আত্মহত্যা কারণ গুলো মানসিকভাবে যাচাই করা যায় বা তাকে যদি সাহায্য করা যায় তাহলে ৮০ পারসেন্ট ঝুঁকিতে থাকা কাউকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, কারও মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, প্রবণতা আছে—সেই ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম কাজ হবে তাকে একা থাকতে না দেওয়া। তার সমস্যাগুলো খুব মন দিয়ে তার মতন করে শোনা। এরকম পরিস্থিতি তাকে দ্রুত সাইকিয়াট্রিস্ট বা সাইকোলজিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে। পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত সচেতনতা বাড়াতে পারলে এটি রোধ করা সম্ভব।

আত্মহত্যা একটি সামাজিক সমস্যা উল্লেখ করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, "দাম্পত্য কলহ, কঠিন রোগ থেকে মুক্তি এবং উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীদের প্রেমঘটিত কারণে সাধারণত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এটি প্রতিরোধ করতে হলে সামাজিকভাবে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন বলেন, "বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রাম'-এর আওতায় প্রায় ১৩০ জন চিকিৎসক ও ৪০ জন নার্সকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক চিকিৎসক অন্য জেলায় বদলি হওয়ায় চিকিৎসক স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। অচিরেই নতুন করে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়া শিক্ষক-সাংবাদিক ও স্কুল পর্যায়ে অরিয়েন্টেশনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আশা করছি আত্মহত্যার প্রবণতা কমে আসবে।