পদ্মার তীব্র ভাঙনে বসতভিটার পর এবার নদীগর্ভে পূর্বপুরুষের কবর

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সোহেল রানা, হরিরামপুর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি

'বাড়িঘর, জমিজমার সাথে এবার আমাদের পূর্বপুরুষের কবরটিও পদ্মা নদীর পেটে চলে গেল।' কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের হরিহরদিয়া এলাকার কবির মোল্লার ছেলে জীবন মোল্লা। পদ্মার তীব্র ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমির পাশাপাশি এবার বিলীন হয়েছে তার পিতামহ (বাবার দাদা) মাঈন উদ্দীন মোল্লার কবরও। দেড় যুগ ধরে যে কবরটি তাঁর বাবা, চাচা ও দাদার কাছে ছিল স্মৃতি ও আবেগের জায়গা, নদীভাঙনে সেটিও এখন আর নেই।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে কয়েক বছর ধরে পদ্মার ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ৪-৫ বছর ধরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দুই হাজারের মতো বসতবাড়ি, হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি। স্থানীয়দের দাবি, হরিহরদিয়া, সেলিমপুর, জয়পুর ও হালুয়াঘাটসহ আশপাশের এলাকায় ভাঙনে এ বছর শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। গত ৪-৫ বছরে চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ, সুতালড়ি ও আজিমনগর ইউনিয়নে আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪ তলা ভবন, হাতিঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কয়েকটি স্কুল ও বাজারসহ হাজার হাজার বাড়িঘর পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। হালুয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা ও ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক ফারুক হোসেন বলেন, 'আমাদের ঘরবাড়ি ও জমি কয়েক বছর আগে নদীতে গেছে।

এখন আবার হালুয়াহাট এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। হড়িনা ঘাট এলাকায় ও ভাঙন রয়েছে। চরাঞ্চলে পদ্মা ভাঙন ঠেকাত কেউ কাজ করে না। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, 'চরের মানুষ অসহায়। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নসহ চরাঞ্চল পদ্মা ভাঙনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

এখন আর তেমন কিছুই নেই। ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো কাজ নেয়া হচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নটাখোলা পুলিশ ফাঁড়ি ও নটাখোলা আফরোজা উচ্চ বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।'

আন্ধারমানিক ঘাট থেকে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে চলাচলকারী ট্রলারের চালক ফরিদ হোসেন বলেন, 'সেলিমপুর গত বর্ষায় শেষ, এ বর্ষায় জয়পুরও শেষের পথে। হালুয়াঘাটেও ভাঙছে। হরিনা ঘাট, আজিমনগর ইউনিয়নেও ভাঙতেছে। এভাবে ভাঙতে থাকলে চর আর থাকবে না, সব পদ্মার পেটে চলে যাবে।'

স্থানীয়রা বলছেন, চরাঞ্চলে কয়েক বছর ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকলেও নদীতীর রক্ষায় স্থায়ী বা অস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন চরাঞ্চলের মানুষ।

হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, 'আমি এক সপ্তাহ হলো এ উপজেলায় যোগদান করেছি। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নদীভাঙনের বিষয়টি আমাকে অবহিত করেছেন। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাব।'

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, গতকাল সোমবার মানিকগঞ্জ ২ আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান, উপজেলা প্রশাসনসহ চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে ভাঙন কবলিত এলাকা ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে।