দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে শহীদ জিয়ার খনন করা পীরতলা খাল
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এম কে রানা, পটুয়াখালী

একসময় বড় বড় নৌকা ও ছোট লঞ্চ চলত। খালের পানিতে ছিল স্বাভাবিক স্রোত। উপজেলা সদরের পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি নৌযান চলাচলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল পীরতলা খালের। সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন শুধু স্মৃতি। দখল ও দূষণের কবলে পড়ে পটুয়াখালীর দুমকীর প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ পীরতলা খাল এখন মৃতপ্রায়।
খালের দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, বসতঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও মাটি ফেলে খালের জায়গা সংকুচিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে খালটি দখল ও দূষণের শিকার হলেও কার্যকরভাবে তা রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ ও খননের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ।
দুমকী উপজেলা সদরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া পীরতলা খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় চার কিলোমিটার। খালটির উত্তরের অংশ আঙ্গারিয়াসহ পায়রা নদীর সঙ্গে এবং দক্ষিণের অংশ শ্রীরামপুর ইউনিয়ন হয়ে লোহালিয়া নদীর মোহনার সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, কয়েক দশক আগেও পীরতলা খাল ছিল এলাকার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। পণ্য পরিবহন ও মানুষের চলাচলে এ খাল ব্যবহার করা হতো।
বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহও ছিল বেশ ভালো। কিন্তু ধীরে ধীরে দুই পাড়ে বসতি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পাশাপাশি খালে বর্জ্য ফেলার কারণে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা শামীম হোসেন বলেন,আগে এই খালে অনেক পানি থাকত। নৌকা চলত। এখন খালের অনেক জায়গা ভরাট হয়ে গেছে। ময়লা-আবর্জনাও ফেলা হয়। পানি ঠিকমতো চলাচল করতে পারে না। আরেক বাসিন্দা নাজমুল হোসেন বলেন, খালটি শুধু নৌযান চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, উপজেলা সদরের পানি নিষ্কাশনেরও বড় একটি মাধ্যম। খালটি যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বর্ষায় আমাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। পীরতলা খালের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরোনো ইতিহাসও। নদীর সঙ্গে পানিপ্রবাহ বজায় রাখার লক্ষ্যে আশির দশকের দিকে খালটি খনন করা হয়। স্থানীয়দের তথ্যমতে, ১৯৮১ সালের ২৭ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে খালটির খননকাজের উদ্বোধন করেন। খালের পাশে সেই উদ্বোধনী ফলক এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকা ফলকটি মনে করিয়ে দেয় খালটির অতীত গুরুত্ব। কিন্তু ফলকের পাশেই এখন পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নেই। অনেক জায়গায় খালের জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে।
স্থানীয় প্রবীণ নেছার উদ্দিন বলেন, আমরা ছোটবেলায় এই খালে নৌকা চলতে দেখেছি। খালের পানি অনেক বেশি ছিল। এখন খালের অবস্থা দেখে কষ্ট লাগে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাল এভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সরেজমিন দেখা গেছে, খালের থানা ব্রিজের উত্তরের সৃজনী বিদ্যানিকেতন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হয়ে পায়রা নদীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় দখলের চিত্র সবচেয়ে বেশি। পীরতলা বাজার এলাকায় খালের জায়গায় গড়ে উঠেছে ২০টির বেশি দোকানপাট। এর পাশাপাশি রয়েছে চারতলা একটি ভবন। কোথাও দোকান বা স্থাপনার অংশ খালের সীমানার দিকে বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও মাটি ফেলে খালের জায়গা ভরাটের চিত্রও দেখা গেছে। থানা ব্রিজের দক্ষিণ পাশে লুথান হেলথ কেয়ার হাসপাতাল পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার এলাকাতেও রয়েছে কয়েকটি স্থাপনা। এর বেশির ভাগই পাকা-আধাপাকা টিনশেড ঘর।
স্থানীয়দের দাবি, এসব স্থাপনার কারণে খালের প্রস্থ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পানি চলাচলের পথও সংকুচিত হয়েছে। খালের জায়গা দখলের অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে খালের জায়গা দখল করেননি। তবে কোনো স্থাপনা খালের সীমানার মধ্যে পড়ে থাকলে প্রশাসন ব্যবস্থা নিলে তা ছেড়ে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা। স্থানীয় ব্যবসায়ী খালেক বলেন, আমরা খালের কোনো জায়গা দখল করিনি। তারপরও যদি আমাদের কোনো স্থাপনা খালের মধ্যে ঢুকে থাকে এবং প্রশাসন সেটি চিহ্নিত করে, তাহলে আমরা জায়গা ছেড়ে দেব। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
আরেক ব্যবসায়ী লিটন বলেন,খালটি ভালো থাকলে আমাদেরও সুবিধা। তবে সঠিকভাবে সীমানা নির্ধারণ করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলে আমাদের আপত্তি নেই।
দখলের পাশাপাশি খালটির বড় সমস্যা দূষণ। খালের বিভিন্ন অংশে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও পানির ওপর ভাসছে আবর্জনা, আবার কোথাও পচা বর্জ্য জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আকরাম নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রতিদিনই কেউ না কেউ খালে ময়লা ফেলে। ময়লা জমে পানি কালচে হয়ে গেছে। গন্ধের কারণে খালের পাশ দিয়ে হাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। আরেক বাসিন্দা নাজমুল বলেন, খালে ময়লা ফেলা বন্ধ করা দরকার। শুধু খনন করলেই হবে না, নিয়মিত নজরদারি করতে হবে। না হলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে পানি নিষ্কাশনে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এতে উপজেলা সদরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ওয়ান-ইলেভেনের সময় পীরতলা খাল দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল। তখন বিভিন্ন স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে কিছু সময়ের জন্য খালের জায়গা দখলমুক্তও হয়েছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে আবারও খালের দুই পাড়ে পাকা-আধাপাকা ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলার প্রবণতাও বাড়তে থাকে। ফলে দখল ও দূষণ-দুইয়ের চাপে খালটি ক্রমেই তার স্বাভাবিক রূপ হারাতে থাকে। স্থানীয় শিক্ষার্থী সুমনা বলেন, শুধু একবার উচ্ছেদ অভিযান চালালেই হবে না। খালের সীমানা নির্ধারণ করে স্থায়ীভাবে দখল বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি যারা খালে বর্জ্য ফেলছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। খালটি উদ্ধারে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। খাল খনন এবং অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। দুমকী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন,পীরতলা খালটি উদ্ধারের জন্য উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কয়কবার মিটিং হয়েছে। খালটি খনন করা হবে এবং অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন কবে শুরু হবে সেই উদ্যোগ? খনন ও উচ্ছেদ অভিযান কবে বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। স্থানীয়দের মতে, পীরতলা খাল শুধু একটি জলপথ নয়; এটি দুমকী উপজেলা সদরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খালটি ভরাট ও সংকুচিত হয়ে গেলে ভবিষ্যতে পানি নিষ্কাশনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই দ্রুত খালের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, খনন এবং বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর ভাষায়, খালটি এখনই বাঁচাতে হবে। আরও কয়েক বছর এভাবে চললে হয়তো খাল খুঁজেই পাওয়া যাবে না। দখল ও দূষণের কারণে ধুঁকতে থাকা পীরতলা খালকে দ্রুত উদ্ধার করা না হলে একসময় এর অস্তিত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়-দ্রুত বাস্তব উদ্যোগের মাধ্যমে ফিরে আসবে পীরতলা খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ।
