রানীগঞ্জ বাজার মন্দির থেকে নুনদহঘাট সড়কের বেহাল দশা
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ঘোড়াঘাট প্রতিনিধি
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ রানীগঞ্জ বাজার, মন্দির থেকে গোস্ত হাটি মোড় হয়ে নুনদহঘাট সড়কের নির্মাণ কাজ শেষ না করেই ঠিকাদার পাত্তা এমন অভিযোগ স্থানীয় এলাকা বাসীর। সড়কে খোয়া বিছিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রাখায় বর্তমানে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত ও খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্তে পানি জমে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন পথচারী, শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ঘোড়াঘাট উপজেল রানীগঞ্জ বাজারের মন্দির মার্কেট থেকে নুনদহঘাট ব্রিজ অতিক্রম করে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় সোয়া ৪ কিলোমিটার সড়কটি সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। রি-সিল পদ্ধতিতে কাজটি বাস্তবায়নের জন্য ৭৮ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৩ টাকা বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়। গত দুই বছর পূর্বে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার মেসার্স মা ইন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়। কিন্তু পুরোনো পিচ অপসারণের কার্যক্রম কয়েকদিন চললেও অজানা কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেষ করা হয়নি। কাজের অগ্রগতি থেমে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদারের দেখা মিলছে না। এতে একদিকে সরকারি অর্থের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে জনগণের ভোগান্তি পরিণত হয়েছে নিত্যদিনের ঘটনায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পূর্বের ঠিকাদারের বিষয়টি বিধি অনুযায়ী নিষপত্তি করে পূর্ণ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ এবং সড়কটি মানসম্মত ভাবে নির্মাণ করতে হবে।
সরেজমিন দেখা যায়, রাণীগঞ্জ বাজার থেকে মন্দিরগস্তহাটি হয়ে নুনদহ ঘাটের দিকে যাওয়া সড়কের বিভিন্ন অংশে বিছানো খোয়া উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য গর্ত। কোথাও কোথাও সড়কের পাশ ভেঙে গেছে। যানবাহনগুলোকে গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে বারবার দিক পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সড়কে খোয়া বিছানোর পর যথাযথভাবে পরবর্তী কাজ না হওয়ায় যানবাহনের চাপে খোয়া ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে কোথাও গর্ত, কোথাও উঁচু-নিচু অংশ তৈরি হয়েছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়রা জানান, সড়কটির উন্নয়নকাজ নিয়ে তারা আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু খোয়া বিছানোর পর কাজের গতি কমতে কমতে একপর্যায়ে প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে— প্রকল্পের কাজ শেষ করার দায়িত্ব কার এবং জনগণের দুর্ভোগের দায়ই বা কে নেবে?
রাণীগঞ্জ বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চলাচল করেন। রাস্তার অবস্থা খারাপ হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ছে। কাজ শুরু করে শেষ না করলে জনগণের ভোগান্তি আরও বাড়বে। দ্রুত কাজ শেষ করা দরকার।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, রাস্তায় খোয়া ফেলার পর সেগুলো উঠে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টি হলে গর্তগুলো পানিতে ভরে যায়। তখন বোঝার উপায় থাকে না কোথায় কতটা গভীর গর্ত। এতে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ে।
আরেক বাসিন্দা বলেন, ঠিকাদার কাজ ফেলে রেখেছেন— এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে শুনছি। কর্তৃপক্ষ যদি ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ শেষ করাতে না পারে, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
সড়কটি স্থানীয় কৃষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার সময় সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষকে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্থানীয় শিক্ষক মো. মাসুদুর রহমান বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সড়ক দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচলের জন্য দ্রুত সড়কটি সম্পূর্ণ করা প্রয়োজন।
স্থানীয় এক কৃষক বলেন, ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য নিয়ে বাজারে যেতে এই রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। রাস্তা খারাপ থাকায় গাড়ি ভাড়া বেশি দিতে হয়। সময়ও বেশি লাগে।
স্থানীয়দের অভিযোগের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো— নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কাজ বন্ধ থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল দপ্তরের নজরে থাকার পরও কেন দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি এ অবস্থায় পড়ে আছে, সেটিও জানতে চান তারা।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের বরাদ্দ, কাজের সময়সীমা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, কাজের অগ্রগতি এবং কাজ বন্ধ থাকার কারণ জনসম্মুখে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিম্নমানের কাজ হয়ে থাকলে তারও তদন্ত দাবি করেছেন তারা।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দাবি, পূর্বের ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার বাস্তব সম্ভাবনা না থাকলে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এরপর পুনঃবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে সড়কের অবশিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। তাদের ভাষ্য, দায়সারা সংস্কার নয়; সড়কের বর্তমান অবস্থা প্রকৌশলগতভাবে যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী ভিত্তি মজবুত করে মানসম্মতভাবে নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সড়কটি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুবানা তানজিন বলেন, রাণীগঞ্জ বাজারুমন্দির থেকে নুনদহ ঘাট পর্যন্ত সড়কটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে। নির্ধারিত ঠিকাদার চুক্তি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না করে থাকলে প্রকল্পের বিধি ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে পুনঃবিজ্ঞপ্তি দিয়ে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ সম্পন্ন করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জনগণের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কোনোভাবেই উপেক্ষা করা হবে না।
ঘোড়াঘাট উপজেলা প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, রাণীগঞ্জ বাজার-মন্দির থেকে গস্তহাটি মোর হয়ে নুনদহ ঘাট পর্যন্ত সড়কের নির্মাণকাজের অগ্রগতি ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করা হবে। ঠিকাদার চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ না করে থাকলে চুক্তির শর্ত ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পুনঃবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের সুযোগ থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সড়কটি দ্রুত চলাচল উপযোগী করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
