কুষ্টিয়ার কৃষকদের নতুন আয়ের উৎস হয়ে উঠছে পাটখড়ি

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এ এইচএম.আরিফ, কুষ্টিয়া

এক সময় চাষের পর ক্ষেতেই পড়ে থাকা একটি অবহেলিত উপজাত ছিল পাট ও পাটখড়ি। গ্রামের মাটির চুলায় গৃহিনীদের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পর এর খুব একটা অর্থনৈতিক মূল্য ছিল না। কিন্তু সময় বদলেছে। পাটখড়ির ব্যবহার বেড়েছে, তৈরি হয়েছে বাজার। এখন কুষ্টিয়ার কৃষকদের কাছে পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়িও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পণ্য হয়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

পাটের বাজার দর নিয়ে কৃষকের প্রত্যাশা সব সময় পূরণ না হলেও পাটখড়ি বিক্রি করে উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশ ঘরে তুলে আনতে পারছেন তারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাটের চেয়ে পাটখড়ি বিক্রি করেই বেশি অর্থ পাচ্ছেন কৃষকরা। ফলে গত কয়েক বছর পাট চাষে লোকসানের অভিজ্ঞতা থাকলেও পাটখড়ির বাড়তি চাহিদা কৃষকদের নতুন করে পাট আবাদে উৎসাহিত করছে।

কুষ্টিয়ায় এক বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনে কৃষকের প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। গড়ে ওই জমিতে ১০ মণ পাট পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতি মণ পাট প্রায় ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ এক বিঘা জমির পাট বিক্রি করে কৃষক পাচ্ছেন প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, একই জমির পাটখড়ি মানভেদে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ফলে পাট বিক্রি থেকে সীমিত লাভ হলেও পাটখড়ির অর্থমূল্য কৃষকের মোট আয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার একতার পরি গ্রামের পাটচাষি যদু মোহন বিশ্বাস বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট আবাদ করতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়।পাট বিক্রি করে খরচ বাদ দিলে খুব বেশি লাভ থাকে না। কিন্তু পাটখড়ি বিক্রি করে বাড়তি টাকা পাওয়া যায়। এতে পাট চাষের খরচ অনেকটাই উঠে আসে।

পাটখড়ির সবচেয়ে পুরোনো ব্যবহার জ্বালানি হিসেবে। গ্রামীণ জনপদে শুকনো পাটখড়ি মাটির চুলায় রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আগে এটি ছিল মূলত; অন্যান্য জ্বালানির সহযোগী।

এখনও গ্রামের অনেক পরিবার শুকনো পাটখড়ি রান্নার কাজে ব্যবহার করে। তবে এর ব্যবহার এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে। বাড়ি ও পান বরজের বেড়া, গোয়াল ঘর কিংবা অস্থায়ী ঘের তৈরিতে পাটখড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। কৃষকরা জমির চারপাশে বেড়া দেয়ার কাজেও এটি ব্যবহার করেন। সবজি বা অন্যান্য ফসলের জমি পশুর হাত থেকে রক্ষা করতে অস্থায়ী বেড়া তৈরিতেও পাটখড়ি কাজে লাগে।

মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান গ্রামের কৃষক পল্টু ফকির বলেন, পাটখড়ি দিয়ে বাড়ির বেড়া দেওয়া যায়। জমির চারপাশেও বেড়া দেওয়া হয়। শুকিয়ে রাখলে জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। তাই এখন পাটখড়ি আর ফেলে রাখার জিনিস নয়। পাটখড়ি শুকিয়ে সংরক্ষণ করাও সহজ।

কৃষকরা মাঠ থেকে পাটখড়ি সংগ্রহের পর রাস্তার পাশে, মাঠে কিংবা বাড়ির উঠানে রোদে শুকিয়ে নেন। ভালোভাবে শুকানোর পর ছোট ছোট আটি করে তা সংরক্ষণ করা হয়। এতে প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করার পাশাপাশি বাজার দর ভালো থাকলে বিক্রি করার সুযোগও থাকে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে খোকসা উপজেলার একতারপুর গ্রামে প্রবেশের মেইন পাকা রাস্তার দু'পাশে পাটখড়ি শুকানোর দৃশ্য দেখা মিলে।

পাটখড়ির চাহিদা এখন শুধু গ্রামে সীমাবদ্ধ নেই। কুষ্টিয়া শহরেও ফেরি করে পাটখড়ি বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এরফলে কৃষকের উৎপাদিত পাটখড়ি সরাসরি গ্রামীণ বাজার ছাড়িয়ে শহরের ভোক্তার কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।

ব্যবসায়ী বোরহান জানান, গত পাঁচ বছর ধরে পাটখড়ির ব্যবসা করছেন। আগে পাটখড়ির ব্যবসা এতটা ছিল না। এখন বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হওয়ায় চাহিদা বেড়েছে। কৃষকের কাছ থেকে মানভেদে এক বিঘা জমির পাটখড়ি প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দরে কিনি। পরে গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে বিক্রি করি। ছোট ছোট আটি করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেচাকেনা করা যায়। তার মতে, পাটখড়ির ব্যবসা ছোট হলেও এর সঙ্গে কৃষক, সংগ্রহকারী ও বিক্রেতা-একাধিক মানুষ যুক্ত হচ্ছেন।

এতে স্থানীয় পর্যায়ে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

কৃষকের ব্যবহারের বাইরে পাটখড়ির আরও বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে পাটখড়ি থেকে পার্টিকেল বোর্ড ও ফাইবারবোর্ডের মতো পণ্য তৈরির সুযোগ রয়েছে। কাগজ তৈরিতেও এর ব্যবহার সম্ভব। এছাড়া হস্তশিল্প ও পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে পাটখড়িকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ড.শওকত হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৬ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। পাটের পাশাপাশি পাটখড়ি বিক্রি করে কৃষকরা উৎপাদন খরচের একটি বড় অংশ তুলে নিতে পারছেন। পাটখড়ির চাহিদা ও ভালো দাম পাওয়ায় পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে পাটখড়ি শুধু কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস নয়, গ্রামীণ শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এতে পাটখড়ির বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার নতুন সুযোগ পাবেন।