কমিউনিটি ক্লিনিকে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা

অবকাঠামো ও ওষুধের অপ্রতুলতাসহ নানা সংকট

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শাহজালাল ভূঞা, ফেনী

প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ফেনীর কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। জরাজীর্ণ অবকাঠামো, ওষুধের অপ্রতুলতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) বিশেষ করে স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারীদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিগত সময়ে এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারি করা হলেও বর্তমানে এ সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রান্তিক মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ১৯৯৯ সালে সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হলেও ২০০১ সালে ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ২০০৮ সালে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পটি পুনরায় চালু করা হয়। এরপর দ্রুত কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মূলত পিপিপির মাধ্যমে এসব কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফেনী জেলায় মোট ১৫১টি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে ফেনী সদরের ৩৭টি, সোনাগাজীর ১৪টি, ছাগলনাইয়ার ৫টি, দাগনভূঞার ১টি, পরশুরামের ২টি ও ফুলগাজীর ৩টিসহ মোট ৬২টি ক্লিনিক ভবন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। বাকিগুলো মোটামুটি ভালো অবস্থায় রয়েছে। ইউনিয়ন ভিত্তিক তালিকায় দেখা যায়, সদর উপজেলায় ধর্মপুর, ছনুয়া, কাজিরবাগ, কালিদহ, ফাজিলপুর ও পাঁচগাছিয়ার বেশ কয়েকটি ক্লিনিক জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়াও সোনাগাজীর বেশ কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থায় একেবারেই বেহালদশা। এছাড়াও ফেনী জেলায় ক্লিনিকের সিএইচসিপির ১৮টি পদশূন্য রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেন একজন ফুল-টাইম কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার। তবে ক্লিনিকের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দিতে তাঁর সাথে আরও দুইজন পার্ট-টাইম সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী যুক্ত থাকেন। এরমধ্য একজন হলেন স্বাস্থ্য সহকারী। তিনি মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে কাজ করেন। তিনি সপ্তাহে ৩ দিন কমিউনিটি ক্লিনিকে উপস্থিত থেকে সেবা প্রদান করেন। তার প্রধান দায়িত্ব শিশুদের ইপিআই বা টিকাদান কর্মসূচির তদারকি, সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি, পুষ্টি কার্যক্রমের তদারকি এবং ক্লিনিকের আগত সাধারণ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসায় সহযোগিতা করা। আরেকজন হলেন পরিবার কল্যাণ সহকারী।

তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে নিযুক্ত কর্মী। তিনিও তার মাঠপর্যায়ের কাজের পাশাপাশি ক্লিনিকের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন। স্বাস্থ্য সহকারীর মতো তিনিও সপ্তাহে ৩ দিন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লিনিকে দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রধান দায়িত্ব মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদান করা। তিনি বিবাহিত দম্পতিদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের প্রসবপূর্ব এবং প্রসবোত্তর সেবার তথ্য হালনাগাদ করেন ও ক্লিনিকে আগত নারীদের কাউন্সিলিং করেন। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারীগণ নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। এতে করে সিএইচসিপিদের দায়িত্ব পালনে বেশ হিমশিম খেতে হয়। তবে সিএইচসিপিদেরও কারো কারো বিরুদ্ধে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে।

কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে মূলত মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, টিকাদান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হয়। তবে অযত্ন অবহেলা, অনিয়ম আর জরাজীর্ণ ভবনের কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল উদ্দেশ্য চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেবা নিতে আসা একজন রোগী জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনগুলো ঝরাজীর্ণ থাকায় এবং সিএইচসিপি'রা অনিয়মিত থাকায় সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

জেলার সোনাগাজী উপজেলার বেশকটি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ক্লিনিকের ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ছাদ থেকে পানি পড়ে, প্রায়ই ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। নানা প্রতিকূলতা নিয়েই প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন মা ও শিশুকে সেবা দিতে হয়। ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়। কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের (সিএইচসিপি) তথ্য মতে, প্রতি মাসে ২৪ প্রকার মেডিসিন কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো পেয়ে থাকে। যার মধ্যে রয়েছে, নাপা, এন্টাসিড, কৃমিনাশক, পাপায়া (কোষ্ঠকাঠিন্য), সালবুটামল (হাঁপানি এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভপালমোনারি ডিজিজ), ভিটামিন, খাবার স্যালাইন, জিংক সিরাপ। এছাড়া, বাচ্চাদের কিছু রোগের সিরাপ। তবে, সেবাপ্রত্যাশী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় এই বরাদ্দ খুবই কম। বিগত সময় এন্টিবায়োটিক ওষুধ সরবরাহ করা হলেও তা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

সদর উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত বেশ কয়েকজন হেল্থ কেয়ার প্রোভাইডার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান , ক্লিনিকে ২৪ প্রকারের ওষুধ দেওয়া হয়। দুই মাসের জন্য সেগুলো দেওয়া হলেও তা মানুষের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এজন্য ১ম মাসের শুরুতেই তা শেষ হয়ে যায়। বিশেষ করে, বাচ্চাদের সর্দি-জ্বর ও পাতলা পায়খানার সিরাপের চাহিদা বেশি থাকলেও তা পরিমাণে কম পাওয়া যায়। বরাদ্দ আর একটু বাড়ালে আমাদের জন্য ভালো হতো।

মাথিয়ারা কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার মেছবাহ জানান, প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০জন মা ও শিশুকে সেবা প্রদান করে থাকেন। ক্লিনিকের পুরাতন ভবনটি কয়েকমাস আগে মেরামত করা হলেও বর্তমানে সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বিরলী কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার রুমা আক্তার জানান, বিগত সময়ের তুলনায় বর্তমানে সেবার মান ও গতি বেড়েছে। এখানে নিয়মিত রোগীরা তাদের প্রত্যাশিত সেবাগ্রহণ করেন।

ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. মো আরিফুজ্জামান বলেন, সকল ঝুঁকিপূর্ণ ক্লিনিকের তথ্য সংগ্রহ করা হচেছ। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।