তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি

নাটোরের গুরুদাসপুরে একই পরিবারের তিন নারীকে গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী নারীরা। লোকলজ্জা ও প্রতিপক্ষের প্রভাবের কারণে তারা থানায় অভিযোগ দিতেও ভয় পাচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের।
গত সোমবার বিকালে গুরুদাসপুর পৌরসভার চাঁচকৈড় গাড়িষাপাড়া মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর আগে ওই তিন নারীকে একটি বাড়িতে আটকে রেখে মারধর এবং সাদা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলেও জানান তারা। ভুক্তভোগী তিন নারীর বাড়ি পাশের চাঁচকৈড় মধ্যমপাড়া এলাকায়। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা প্রবাসে থাকায় তারা নিরাপত্তহীনতায় ভুগছেন।
ভুক্তভোগী নারীদের অভিযোগ, একটি অভিযোগের জেরে যুবদল নেতা জিয়াউর রহমান জিয়া তার অনুসারীদের নিয়ে সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাদের বাড়িতে যান। একপর্যায়ে তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে টেনেহিঁচড়ে জিয়ার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের দাবি, সেখানে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে তাদের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
সন্ধ্যার আগে জিয়ার অনুসারীরা তাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকার সড়কে ঘোরান। পরে সাদা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। ওই তিন নারীর একজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি বা আমার মেয়ে কোনো অন্যায় করে থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।' তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। আরেক নারী বলেন, তার স্বামী বিদেশে থাকেন। তার মেয়েরও সাত মাস আগে বিয়ে হয়েছে এবং জামাই বিদেশে থাকেন। তার অভিযোগ, এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে। প্রকাশ্যে এমন ঘটনা ঘটলেও উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসেনি বলে দাবি করেন তিনি।
ওই নারী আরও অভিযোগ করেন, গত ২২ সেপ্টেম্বর যুবদল নেতা জিয়া তাদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন। এরপর গতকাল সোমবার ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল নিয়ে তাঁদের বাড়িতে যান। সে সময় তার নববিবাহিত মেয়ে ও বৃদ্ধ মা বাড়িতে ছিলেন। তাদের চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে বের করে নেওয়া হয় এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ তার। ভুক্তভোগীদের দাবি, যুবদল নেতা জিয়ার ভাতিজির সঙ্গে তাদের পরিবারের এক তরুণের বিয়ের কথা ছিল। পরে সেই বিয়ে আর হয়নি। প্রায় এক বছর আগে জিয়ার ভাতিজির অন্যত্র বিয়ে হয়।ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ওই বিয়ের পর জিয়ার ভাতিজি অসুস্থ হয়ে পড়লে জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদের পরিবারের ওপর 'কালো জাদু' করার অভিযোগ তোলেন। এ বিরোধের জেরেই তাদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
তবে 'কালো জাদু' করার অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে যুবদল নেতা জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আমার হাত ভেঙে যাওয়ার পর থেকে আমি বিছানায় রয়েছি। জিয়ার বড় ভাই ইয়ারুল সরদার বলেন, তার মেয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার দাবি, বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও মেয়ের অসুস্থতা ভালো হয়নি। পরে কবিরাজ ও মাওলানাদের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করানোর সময় তার মেয়েকে 'কালো জাদু' করা হয়েছে বলে তারা জানতে পারেন।
ইয়ারুল সরদার দাবি করেন, এ বিষয়ে প্রায় দুই মাস আগে তিনি থানায় একটি অভিযোগও করেছিলেন। তার ভাষ্য, ভুক্তভোগী নারীদের একজনের বিরুদ্ধে 'কালো জাদু' করার অভিযোগ ছিল। পরে মহল্লার লোকজন ওই নারীদের ধরে এনে জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরান।
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, তিনজন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে হেনস্তা করার বিষয়ে তিনি কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
