পরিবারের চারজন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত

মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় পরিবার

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  পটুয়াখালী প্রতিনিধি

একটি পরিবারে বাবা-মা, ছেলে-মেয়েসহ চারজন মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। পরিবারের আরেক সদস্য নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। উপার্জনক্ষম সদস্যের সীমিত আয়ে সংসার চালানো, অসুস্থদের দেখাশোনা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা ও উন্নত চিকিৎসার প্রত্যাশায় দিন কাটছে তাঁদের। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বগা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বামনিকাঠি গ্রামের এই পরিবারটির করুণ পরিস্থিতি স্থানীয়দেরও ভাবিয়ে তুলেছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃদ্ধ বাবা ইউসুফ হাওলাদার, মা ফুলচান এবং তাঁদের বড় ছেলে নুরুল ইসলাম ও বড় মেয়ে রাসেদা মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। পরিবারের ছোট ছেলে সবুজও নানা শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত। ফলে পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ইউসুফ হাওলাদারের বয়স প্রায় ৭০ বছর। তাঁর স্ত্রী ফুলচানের বয়স ৬০ বছর। তাঁদের বড় ছেলে নুরুল ইসলামের বয়স ৩৭ বছর। বড় মেয়ে রাসেদার বয়স ৩২ বছর। পরিবারের দাবি, এই চারজনই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে তাঁদের রোগের ধরন ও কারণ সম্পর্কে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন। পরিবারের মেজো ছেলে জব্বারের বয়স ২৬ বছর। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। অন্যদিকে, ১৮ বছর বয়সী ছোট ছেলে সবুজ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছে পরিবার। ২৮ বছর বয়সী মেয়ে লাবলি বিয়ে করে স্বামীর সংসারে থাকেন। ফলে পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের দেখাশোনা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, একজনের অসুস্থতার সঙ্গে অন্যজনের দেখাশোনার দায়িত্বও এসে পড়েছে স্বজনদের ওপর। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার ও নিরাপদ জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা তাঁদের পক্ষে সব সময় সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে পরিবারের একাধিক সদস্যের নিয়মিত পরিচর্যার প্রয়োজন হওয়ায় আর্থিক সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। পরিবারের বড় মেয়ে রাসেদা অনেক সময় বাড়ির বাইরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। তাঁর নিরাপত্তা ও নিয়মিত পরিচর্যা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে পরিবারের সদস্যদের। একই সঙ্গে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজন মেটানো তাঁদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেশীদের কেউ কেউ মনে করেন, পরিবারটির সদস্যদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, যথাযথ চিকিৎসা, নিয়মিত পরিচর্যা ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে পরিবারটির দুর্ভোগ কিছুটা কমতে পারে।

তবে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মানসিক সমস্যার পেছনে বংশগত বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা চিকিৎসকের পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

পরিবারের ছোট ছেলে সবুজ বলেন,আমরা সকলেই কম বেশী অসুস্থ। বড় বোন সারাদিন পথে পথে ঘোরে।যেতে না দিলেই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তাই বাধা দেই না। বড় ভাই নুরুল ইসলাম সারাদিন পানি টেনে গোবর, মাটি ও ময়লা মিশিয়ে সকল জায়গায় ছেটাতে ব্যাস্ত থাকে। আমি কিছুদিন আগে নিজে চিকিৎসার জন্য পটুয়াখালী হাসপাতাল গিয়ে ভর্তী হয়েছিলাম। টাকার অভাবে চিকিৎসা না নিয়েই বাড়িতে চলে এসেছি। এখনো আমার শরীরটা খারাপ লাগছে।

পরিবারটির সদস্যদের চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর পরিবারটির খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেবে।

স্থানীয়দের মতে, পরিবারটির সংকট কেবল আর্থিক অনটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অসুস্থ সদস্যদের নিয়মিত দেখাশোনা, চিকিৎসকের কাছে নেওয়া এবং তাঁদের নিরাপদে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন, তাঁদের জন্য পরিবারের পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন। মিল্টন নামে এক প্রতিবেশী বলেন, শুরুতে বা ছোটবেলায় একদম স্বভাবিকই ছিল বিয়েসাদি করার পর একটা বয়সে এসে একে একে পরিবারের চারজনের মানসিক সমস্যা আমাদের অবাক করেছে। হয়তো উন্নত চিকিৎসা পেলে হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পাতো এরা।

মোয়াজ্জেম নামে এক স্বজন বলেন, ওদের বাবা ইউসুফ হাওলাদার বিয়ের আগে থেকেই একটু ব্যাতিক্রমী মানুষ ছিলেন। সকলে যখন ট্রাক্টর দিয়ে হালচাষ করতো তখন তিনি একা একা পুরো মাঠ কোদাল দিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চাষ করতেন আর একা একা কথা বলতেন। এখনো সকে যে পথে হাটে তিনি সে পথে হাটেননা।অন্য পথে চলাচল করেন।আমাদে সাধ্যমত চিকিৎসা করিয়েছি আর পারিনা। সরকার যদি একটু উন্নত চিকিৎসার ব্যাবস্থা করতো তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো।

এদিকে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে বাউফল উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ পরিবারটির খোজ খবর নিয়ে সার্বিক সহযোগিতা তিনি করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। পরিবারটির সদস্যদের দ্রুত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা, প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে তাঁদের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগও যাচাই করা প্রয়োজন।

বামনিকাঠি গ্রামের এই পরিবারটির প্রত্যাশা, প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেবে। যথাযথ চিকিৎসা, নিয়মিত পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে পরিবারের সদস্যদের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। স্থানীয়দেরও দাবি, সহানুভূতির পাশাপাশি পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।