অর্থাভাবে দুই শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  খুলনা ব্যুরো

খুলনার ফুলতলা উপজেলা থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার খুলনা-যশোর মহাসড়কের পশ্চিম পাশে দৃষ্টি নন্দন ব্যক্তি মালিকানাধীন সুপার জুট মিল। আবার ফুলতলা শেষ সীমানায় উত্তর ডিহিতে রয়েছে বিশ্বমানের চামড়া ফ্যাক্টরি সুপারেক্স লেদার লিমিটেড। যার অবকাঠামো এবং সম্পত্তির বাজার মূল্য হাজার কোটি টাকার ওপরে। এই গল্পটি একদিনে হয়নি। কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য স্পৃহায় তিল তিল গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠান দুইটি এখন লোকসানের ঘানি টানছে। অথচ যার একদিনে আয় হতো ৩০ লাখ টাকা।

ফুলতলার হত দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা শিল্পপতি ফিরোজ আহমেদ ভূইয়া বলেন, জীবনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ শুরু করি। প্রথমে কাঁচামাল বিক্রি পরে আম ব্যবসা জ্বালানি কাঠ ও সাইজ কাঠ ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলাম। যা দিয়ে অনেক লাভ হচ্ছিল। পরবর্তীতে ইটের ভাটা ব্যবসা শুরু করি। সেখানেও ভালো আয় হচ্ছিল। তখন ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে ২০০৬ সালে তিনি মাত্র ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সুপার জুট মিল প্রতিষ্ঠা করেন। ইরানের পরিত্যক্ত জুট মিলের যন্ত্রাংশ ২৫ কোটি টাকায় ক্রয় করে লাভ করেন ২০ কোটি টাকা। এরপর আর পেছনে ফিরতে হয়নি। প্রায় ১৫ এক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই জুট মিলটি বিশ্বের ২৪টি দেশে পাটের সুতা রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। তখন দিনে আয় হতো ৩০ লাখ টাকা। একটা সময় দেশের চতুর্থ বৃহৎ ব্যক্তি মালিকানাধীন জুট মিল হিসেবে অর্জন করে। পরপর তিন বছর সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মাননা অজন করে। দুটি কারখানায় প্রায় ১১ শ'র অধিক শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করছে। প্রতিষ্ঠান দুটির অধিকাংশ লেন-দেন ইসলামি বাংলাদেশ লিমিটেড পিএলসি'র মাধ্যমে হতো। ২০১৪ সালের দিকে ইসলামি ব্যাংকের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার তারল্য ছিল। তখন লেন-দেন টাকা ভালো এবং সৎ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঋণ বিতরণের জন্য তৎকালীন ব্যাংকের এমডি আব্দুল মান্নান দেশের ২০ জন শিল্পপতিদের ডাকেন। খুলনা থেকে শিল্পপতি ফিরোজ আহমেদকে নতুন শিল্প গড়ার আহবান জানান এবং ব্যাংকের এমডি এবং জোনাল ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের মাধ্যমে মৌখিকভাবে তাকে ১০০০ (এক হাজার) কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, অতীতে আমার সবচেয়ে ভালো লেন-দেন থাকায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে বেছে নেন। সেই আশ্বাসে তিনি ফুলতলা উত্তর ডিহিতে নিজের ও ইসলামি ব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ৪০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বমানের সুপারেক্স লেদার লিমিটেড।

দুই বছরের মধ্যে ৪ লাখ স্কয়ার ফিটের লেদার ট্যানারি স্থাপন করা হয়। ফ্যাক্টরিতে রয়েছে বিশ্বমানের মেশিনারিজ, ইটিপি প্লান্ট ও স্থাপনা। লেদার ফ্যাক্টরির ধারণ ক্ষমতা কোল্ড স্টোরে ৫ লাখ গরু ও ২ লাখ চাগলের চামড়া সংরক্ষণের সুব্যবস্থা রয়েছে। যা দেখে ইউরোপের ইটালি, জার্মানি, নেদার্রযান্ডসহ কয়েকটি দেশের পরিদর্শক বলেছেন তাদের দেখা বিশ্বের সেরা এটি। এটিকে তারা গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। ফ্যাক্টরির ভেতের ছায়া ঘেরা নানা জাতের বৃক্ষরাজি অনন্য বৈশিষ্ট সকলকে মুগ্ধ করে। যার রয়েছে ডব্লিউএলজি সনদ। পরিবেশ সম্মত গ্রিন ফ্যাক্টরিটি এশিয়ার ভেতরে সর্ববৃহৎ এবং বাংলাদেশর মধ্যে ১ নম্বর। যেখানে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন হলে দেশের ২০ ভাগ কাঁচা চামড়া এখান থেকে পাকা চামড়া করা সম্ভব। এটি করতে তিনি নিজের এবং জুটমিলের মূলধন হতে ২০০ কোটি টাকা লেদার ফ্যাক্টরিতে স্থানান্তর করেন। কিন্তু ১ হাজার কোটি ঠাকার ঋণ দেওয়ার স্থলে ব্যাংক তাকে মাত্র ২৩০ কোটি টাকা প্রদান করে আর কোনো অর্থ দেয়নি। অপরদিকে মূলধন টান পড়ায় জুটমিলের কাঁচামালের অভাবসহ নানাবিধ সঙ্কট দেখা যায়। তখন উভয় সঙ্কটে পড়েন। না পারেন ঠিক মতো জুট মিল পচিালনা করতে, না পারেন লেদার ফ্যাক্টরিকে পূর্ণমাত্রায় পরিচালনা করতে। এরই মাঝে ঋণের ভার চাপতে থাকে।

ফিরোজ আহমেদ বলেন, বর্তমানে ব্যাংক তাকে খেলাপি ঋণ পরিশোধের তাগিদ দিচ্ছে। তিল তিল করে গড়ে তোলা এই দুটি শিল্প প্রতিষ্ঠান এখন ফিরোজ ভূইয়ার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাভাবে দু'টি কারখানা পূর্ণ উৎপাদন করতে পারছেন না। আবার ঋণের বোঝা প্রতিদিন ভারী হচ্ছে। বর্তমানে দুটি মিলের ঋণ ৪৩০ কোটি টাকা। আর গ্রস ঋণসহ সুদ-আসল মিলে প্রায় ৯০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "জুট মিল থেকে আমার দিনে ৩০ লাখ টাকা আয় হতো, ইসলামি ব্যাংক আমাকে লেদার ফ্যাক্টরির স্বপ্ন না দেখালে আমি আজ ঋণ খেলাপি হতাম না। তিনি বলেন, আমার দুটি কারখানা চালাতে এখন প্রয়োজন ৩০০ কোটি টাকা। এটি ইসলামি ব্যাংক অথবা অন্য কোনো ব্যাংক সুদ মুক্ত করে নতুন করে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দিলে আগামী দুই বছরের মধ্যে তিনি সমুদয় ঋণ পরিশোধ করতে পারবো। লেদার ফ্যাক্টরির মধ্যে ১৫ একর জায়গা আছে, যেখানে শতভাগ রপ্তানি যোগ্য লেদার ব্যাগ বা চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। প্রতিদিন ১০ হাজার ব্যাগ তৈরি হবে এবং ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে।