ছাতিম ফুলে বিমোহিত প্রকৃতিপ্রেমীরা

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নুর উল্লাহ আরিফ, চরফ্যাশন (ভোলা)

দিনের আলোয় দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য আর রাতের জোস্নালু স্নিগ্ধতার সাথে ম-ম গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে পড়ছেন চরফ্যাশনের প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকরা। হেমন্তের সন্ধ্যাতারা পশ্চিমাকাশে উঁকি দেওয়ার সাথে সাথেই চরফ্যাশন ফ্যাশন স্কয়ার চত্বর ছাতিম ফুলের ছড়িয়ে দেওয়া সুরভিত ঘ্রাণে হয়ে ওঠে বিমোহিত। ছাতিম ফুলের মিষ্টি সুবাসে শহরময় বাতাসে যেন ছড়িয়ে পড়ছে নতুন ঋতুর আগমণি বার্তা। নবান্নের উৎসব শুরু না হলেও ছাতিম ফুলেরা যেন কাছে ডেকে বলে দেয় প্রকৃতিতে এসেছে ঋতুকন্যা হেমন্ত। এমনি মন মাতানো গন্ধে অনেকে ছুটে আসেন চরফ্যাশন শিশু বিনোদন পার্কের তোরণ পয়েন্টে।

সবুজাভ সাদা ফুলগুচ্ছের সুবাস ছড়ানো মাদকতাময় ঘ্রাণে মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী, শিক্ষার্থী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা। ব্যস্ত জীবনে ছাতিম ফুলের নয়াভিরাম সৌন্দর্য যেন এনে দিয়েছে স্বস্তির পরশ। চরফ্যাশন পৌরসভার ফ্যাশন স্কয়ার-সংলগ্ন শিশু ও বিনোদন পার্কের বাম পাশের দেয়ালের আস্তরণ ঘেঁসে রয়েছে তরতাজা ছাতিমের অস্তিত্ব। ফুলে ফুলে সুশোভিত ঢালপালায় নিজেই নিজের স্বকীয়তার জানান দিচ্ছে প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে। গাছের ডালে ডালে ফুটেছে দৃষ্টিনন্দন ফুল। থোকা থোকা ফুলের সবুজাভ আহবান দৃষ্টি কেড়ে নেয় নিমিষেই। অন্যদিকে, চরফ্যাশন উপজেলা পরিষদ ভবনের দেয়ালঘেঁষে থাকা আরেকটি ছাতিমগাছও ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়েছে। গাছ দুটির রঙিলা ফুলের বিকশিত রূপ উপজেলা চত্বর এবং পার্কে ঘুরতে আসা মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে নিজেদের দিকে।

প্রকৃতির এই অনাড়ম্বর আয়োজন মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য মানে নীরব উদাত্ত আহবান প্রশান্তির পরশ নিতে বিমোহিত পর্যটনপ্রেমীদের সমীপে। কবির কবিতায় ফুটে উঠেছে ছাতিম ফুলের স্বকীয়তার বয়ান, মন আমার আজ মেতেছে ছাতিম ফুলের গন্ধে আছে গভীর রাত, জ্যোৎস্নার আলো, আর কেউ তো নাই সঙ্গে। শরৎ শেষে হেমন্তের ওই আগমনী গান, কেমন তার বাজছে দেখ হৃদয়ে সুরের কলতান।

এমন ক্ষণে ফুটেছে ছাতিম ফুলের রাত, জ্যোৎস্নার আলো, কী অপরূপ প্রকৃতির সাজ।' কবি গোলাম মোহাম্মদও তার কবিতায় ছাতিম ফুলের গন্ধকে ঘরের কোণে, উঠানে এবং মনে ভরা এক সোহাগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ছাতিম ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়, বাংলা সাহিত্যাঙ্গণে রয়েছে এর বিশেষ আবেদন নিবেদন। গান, কবিতা ও কথাসাহিত্যে ছাতিমের সুবাস কখনও স্মৃতি, কখনও নিঃসঙ্গতা, আবার কখনও ভালোবাসা ও প্রশান্তির প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলা এই গাছকে দিয়েছে বিশেষ সাংস্কৃতিক তাৎপর্য। চরফ্যাশনের ছাতিমগাছ দুটিও যেন প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে এক নীরব সংযোগ।

বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম ফোরকান বলেন, ছাতিম ফুল দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এর সুবাসও মন মাতানো। পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যে মাঝে মাঝে নির্মল প্রকৃতির সানিধ্য পেতে মন চায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য স্পর্শে মন প্রশান্তি পায়। এখানকার ছাতিম ফুলের ছোঁয়ায় হৃদয়ে প্রশান্তির পরশ পেলাম। আমাদের চারপাশে আরও বেশি গাছ লাগানো এবং বিদ্যমান গাছগুলোর যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাবাজার কলেজের বাংলা বিষয়ের প্রভাষক নাজমুল হাসান বলেন, প্রকৃতির এক অপূর্ব আর চমৎকার নিদর্শন ছাতিম ফুল। সাধারণত শরৎ আর হেমন্ত ঋতুর সন্ধিক্ষণে এ ফুল ফোটে। এ ফুলের বিশেষত্ব হলো তীব্র সুগন্ধ আর অপরূপ সৌন্দর্য। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আরণ্যক' উপন্যাসে ছাতিম ফুলের চমৎকার বিবরণ আছে। সন্ধ্যায় কিংবা ভোরবেলা ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ গ্রাম বাংলার প্রকৃতিকে আরো মনোমুগ্ধকর করে তোলে।

পরিবেশ কর্মী সানজিদুল ইসলাম বলেন, চরফ্যাশনের সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কার্যালয় ও বিনোদনকেন্দ্রে উপযোগী গাছ লাগানো এবং বিদ্যমান বৃক্ষ সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসন, পৌর কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক রুমানা আফরোজ বলেন,উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক ও ভবন নির্মাণ নয়, মানুষের জন্য নির্মল পরিবেশ এবং স্বস্তির পরিসর নিশ্চিত করাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চরফ্যাশনের ছাতিমগাছ দুটি সেই কথাই নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছে। তাদের যত্নের মধ্য দিয়ে ছাতিমের সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক আরও দূর প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সংরক্ষণের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলুক নতুন করে।