রংপুর অঞ্চলে আমন ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুর ব্যুরো

চলতি মৌসুমে বর্ষাকালে তুলনামূলক কম ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হওয়া সত্ত্বেও, সরকারের কৃষি প্রণোদনা রংপুর কৃষি অঞ্চলের ৫ জেলায় রোপা আমন ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এতে কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা অত্যন্ত আনন্দিত। পোকা দমনে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হইছে ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক অফিস সূত্রে জানা গেছে- রংপুর কৃষি অঞ্চলে ৫ জেলায় রোপা আমন ধানের চলতি মৌসুমে প্রণোদনা বিতরণ করা হয় ১,০৭,০০০ জন কৃষকের মধ্যে। প্রতি জন কৃষককে ২০ কেজি সার ৫ কেজি ধানের বীজ দেয়া হয়। চলতি বছর ৫ জেলায় হাইব্রিড ৩১৪২২১ মেট্রিক টন. উফশী ১৬৭০০৭০ মেট্রিক টন,স্থানীয় জাতের ২০৭৩৭ মেট্রিক টন মোট ২০০৫০২৮ মেট্রিক টন উৎপাদন হবে। গত বছর ৫ জেলায় উৎপাদন হয়েছিল ২০০২৪৯৬ মেট্রিক টন রোপা আমন ধান । কৃষি বিভাগ আরও আশা করছে গত বছরের চেয়ে ২৫৩২ মেট্রিকটন বোরো আমন ধান উৎপাদন হবে।
চলতি মৌসমেু রংপুর জেলায় ৫৪৮৮৮৬১ মেট্রিক টন,গাইবান্ধা জেলায় ৪২৬৭৪৩ মেট্রিক টন,কুডিগ্রাম জেলায় ৩৮৯১০৪, লালমনিরহাট জেলায় ২৭০৬২৯, নীলফামারী ৩৬৯৬৯১ মেট্রিক টন রোপা আমন উৎপাদন হবে বলে কৃষি বিভাগ আশা করছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার রংপুর জেলায় এক লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়েছে। আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধানের ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার জেলায় খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। এ চাল দিয়ে অন্য জেলার চাহিদাও মেটানো সম্ভব হবে।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল আলম জানান চলতি বছর রংপুর জেলায় এক লাখ ৪৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মোট রোপা আমন আবাদি জমির প্রায় ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লাইভ পার্চিং বা ধইঞ্চা গাছের মাধ্যমে এবং এক লাখ ৩১ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে ডেড পার্চিং বা গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি ও বাঁশের বাতা ব্যবহার করে পাখি বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ ডক্টর এস এম আবু বকর সরিফুল জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে এই অঞ্চলে আমন ধানের বাম্পার ফলনের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। মৌসুমী বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ায়, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থার সহায়তায় কৃষকরা প্রয়োজনে আমন ক্ষেতে সেচ দিয়েছেন, যার ফলে ধানের চারাগুলো ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পেরেছে। এছাড়া, পুরো মৌসুমজুড়ে মাঝে মাঝে হওয়া বৃষ্টিপাত আমন ধানের চারা বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে টনিকের মতো কাজ করেছে। কৃষিবিদ ইসলাম বলেন, মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় আমন ধানের চারাগুলো বর্তমানে বেশ ভালোভাবে বেড়ে উঠেছে। এর অর্থ হলো, ফসল কাটার আগ পর্যন্ত আর বৃষ্টি না হলেও এবার আমন ধানের বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি আরও জানান, যদি শীঘ্রই বৃষ্টিপাত হয় অথবা অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে দেরিতে রোপণ করা আমন ক্ষেতগুলোতে কৃষকরা আরও এক-দুবার সেচ দিতে পারেন, তবে সেখানেও ফলন বেশি হবে। বর্তমানে আমন ধানের বিভিন্ন পর্যায়ের অবস্থা হলো-২.৩৫ শতাংশ জমিতে ছড়া বের হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়, ২৪.৪৩ শতাংশে থোড় আসা (বুটিং) পর্যায়, ৩৩.৫৮ শতাংশে ফুল আসা পর্যায়, ১৬.২৬ শতাংশে দানা গঠনের প্রাথমিক পর্যায় (মিল্কিং স্টেজ), ১৩.৫৯ শতাংশে দানা শক্ত হওয়ার পর্যায় (ডাফ স্টেজ), ৬.৫০ শতাংশে পাকা পর্যায় এবং ৩.২৯ শতাংশ জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গেছে। এর আগে, বর্তমান সরকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ বছর এই অঞ্চলে ৬,২১,৫৫০ হেক্টর জমিতে ২০,০৫,০২৮ টন পরিষ্কার চাল (ধানের হিসাবে ৩০,০৭,৫৪২ টন) উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে বৃষ্টিপাতের স্বল্পতার কারণে পানির সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, এই অঞ্চলের কৃষকরা শেষ পর্যন্ত ৬,২১,৬৯০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করেছেন-যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪০ হেক্টর বেশি। এর মধ্যে চলতি মৌসুমে ১,১৩,০০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ করা হয়েছে। বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটার কাজ চলছে এবং আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তা পুরোপুরি শেষ হবে। সোমবার পর্যন্ত এই অঞ্চলে কৃষকরা ২২,৪৩৬ হেক্টর জেলা জমির স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কেটে ফেলেছেন, যা থেকে ৯০ ৬৪,৯৭৩ টন পরিষ্কার চাল (ধানের হিসাবে ৯৯,৪৬০ সয়ও টন) পাওয়া গেছে। ভালো ফলনের পাশাপাশি নতুন জেল আমন ধানের অনুকূল বাজারমূল্য গ্রামীণ এলাকার কৃষকদের মাঝে আনন্দ বয়ে এনেছে। এই কৃষি অঞ্চলের পাঁচটি জেলা-রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে-কৃষক পরিবারগুল্যে এখন ঐতিহ্যবাহী 'নবান্ন' উৎসব পালন করছেন।
সম্প্রতি রংপুরের বিভিন্ন এলাকার আমন ধানের মাঠ জেলা পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত পরিচালক আরো জানান, কৃষকরা এবার আমন ধানের বাম্পার ফলন পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। আগামী মাস থেকেই ধান কাটার কাজ অতিধিক পুরোদমে শুরু হবে। এই অঞ্চলে আমন ধানের বিশাল মাঠজুড়ে কোথাও পাকা, কোথাও আধা-পাকা, আবার কোথাও বেড়ে ওঠা ধানগাছ এক মনোরম ও চিত্তাকর্ষক প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার কৃষক মফিজার রহমান, বাবুল হোসেন, সোলায়মান আলী ও বদিউল ইসলাম জানান, স্বল্পমেয়াদি আমন ধান চাষ করে তারা দারুণ ফলন পাচ্ছেন। অন্যান্য অনেক কৃষকের মতো রংপুর সদর উপজেলার কাঠিহারা গ্রামের আলহাজ ইসহাক আলী পাশাপ জানান, তিনি আগামী মাস থেকে তার জমিতে লাগানো চলা। আমন ধান কাটা শুরু করবেন। তিনি বলেন, আমাদের এলাকার কৃষকরা এবার প্রতি একর জমিতে ৫০ মণ পর্যন্ত সচেল আমন ধান পাওয়ার আশা করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ ডক্টর এস এম আবু বকর সরিফুল আরো বলেন, বর্তমান সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করছেন, যাতে পুরো অঞ্চলে আমন ধানের কার্যলা উৎপাদন সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এ মৌসুমে আমন ধান চাষের সময় কৃষকরা জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি শেরপা পোকা দমন ও ভালো ফলন নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব ইয়াসমি 'পার্চিং' (জমিতে ডালপালা পুঁতে দেওয়া) পদ্ধতি এবং অর্জিনিয় 'লাইট ট্র্যাপ' (আলোর ফাঁদ) ব্যবহার করেছেন।
