কেশবপুরে ঐতিহ্য ধরে রাখতে ব্যস্ত গাছিরা
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
মশিয়ার রহমান, কেশবপুর (যশোর)

কেশবপুরের 'যশ, খেজুরের রস' এ ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে আগে ভাগেই খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। পানির চাপ কম থাকায় গত বছরের তুলনায় এ বছর খেজুরের গুড় উৎপাদনের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করছেন গাছেরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কেশবপুর উপজেলায় প্রায় ৪৭ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে গাছির সংখ্যা ৩৮০ জন। তবে বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী খেজুর গাছ ও গাছির সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে। তার জ্বালানি সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে খেজুর গাছির সংখ্যাও কমেছে।
জানা গেছে, এক সময় খেজুরের গুড় উৎপাদন ও বিপণনের জন্য সারা দেশের মধ্যে কেশবপুর বিখ্যাত ছিল। ১৯৮৬ সালের বন্যার আগ পর্যন্ত এলাকাটি খেজুরের গুড়ের অন্যতম প্রধান মোকাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও ইট ভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ উপজেলায় খেজুর গাছের সংখ্যা কমতে থাকে। শত বছর ধরে কেশবপুরের খেজুরের গুড়ের সুনাম রয়েছে দেশ-বিদেশে। এই খেজুরের গুড় শিল্পকে কেন্দ্র করেই কেশবপুর শহরের হরিহর ও বুড়িভদ্রা নদীর তীরে একসময় গড়ে উঠেছিল গুড় তৈরির বহু কারখানা। কপোতাক্ষ নদের তীরের ত্রিমোহিনী বাজারেও এই শিল্পের বিকাশ ঘটে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, ১৮ শতকের শেষভাগ ও ১৯ শতকের শুরুর দিকে এ অঞ্চলের খেজুরের গুড় ও পাটালি ব্রিটেনে রপ্তানি করা হতো।
সরেজমিনে ঘুরে কেশবপুর সদর ইউনিয়নের মুলগ্রাম জামতলা এলাকার দাসপাড়া সড়কে দেখা যায়, খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন গাছি আজিজুর রহমান। তিনি জানান, প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬টি খেজুর গাছ কাটতে হয় তাকে। বিশেষ করে রস সংগ্রহের জন্য খেজুর গাছ কাটার উপযুক্ত সময় হল দুপুর বেলা। ঠিক এ সময় খেজুর গাছ কাটা হলে সকাল পর্যন্ত রস টাটকা থাকে। আর এই টাটকা রস দিয়েই তারা ভালো মানের গুড় ও পাঠালি তৈরি করে দেশ ও দেশের বাইরে রপ্তানি করে কেশবপুরের খ্যাতি ধরে রেখেছেন। তিনি জানান, কেশবপুর উপজেলার ১৪৪ টি গ্রামেই কম-বেশি খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে। স্থানীয় গুড় ব্যবসায়ী অলিয়ার রহমান বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে কেশবপুরে প্রায় ২ কোটি টাকার খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদন হতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।
কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, খেজুরের গুড় উৎপাদন বাড়াতে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নতুন খেজুর গাছের চারা রোপণের জন্য প্রদর্শনী প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে চলতি বছর সুফলাকাটি ইউনিয়নে সুফলাকাটি গ্রামে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সকল প্রস্তুতি সম্পন্নের পথে। এছাড়া নিরাপদ পদ্ধতিতে গুড় উৎপাদনে গাছিদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে কেশবপুরের গুড় রপ্তানির উপযোগী মান অর্জন করতে পারে। শীতকালে বাদুড়ের উপদ্রব থেকে রস সুরক্ষিত রাখা এবং স্বাস্থ্যসম্মত গুড় তৈরির বিষয়ে গাছিদের পরামর্শ দিচ্ছেন মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা।
