পঞ্চগড়ে কার্তিক মাসে আমন কাটার ধুম

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  পঞ্চগড় প্রতিনিধি

একসময়ের অভাব আর আশ্বিন-কার্তিকের টানাপোড়েনের দিন পেছনে ফেলে উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়ে এখন আনন্দের জোয়ার। প্রথা ভেঙে অগ্রহায়ণের পরিবর্তে কার্তিকের শুরুতেই মাঠে পাকতে শুরু করেছে আগাম জাতের আমন ধান। জেলার বিভিন্ন স্থানে ধান কাটা ও ঘরে তোলার উৎসবে মেতেছেন কৃষকরা। বাম্পার ফলন এবং একই জমিতে একাধিক ফসল ফলানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় কৃষকের মুখে চওড়া হাসি ফুটেছে। তবে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় ন্যায্যমূল্য পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা। আগে আমন ধান রোপণের পর অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত কৃষিশ্রমিকদের হাতে তেমন কাজ থাকত না। আশ্বিন-কার্তিক মাসকে মঙ্গা বা অভাবের সময় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কাজের সন্ধানে তখন অনেক শ্রমিককে অন্য জেলায় পাড়ি জমাতে হতো।

কিন্তু বর্তমানে চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আগাম জাতের আমন ধান চাষ এবং ধান কাটার পরপরই জমিতে আগাম শীতকালীন শাকসবজি আবাদের সুযোগ তৈরি হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি এসেছে। কৃষকদের পাশাপাশি শ্রমিকদের কাজের সুযোগও বহুগুণ বেড়ে গেছে। উঁচু জমির আগাম জাতের ধান পেকে যাওয়ায় অনেক বাড়িতে এখন নতুন ধানের পিঠা-পুলি তৈরির সুবাস ছড়াচ্ছে।

কৃষকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলে প্রকৃতিনির্ভর আমন ধান চাষ হয়ে আসছে। আগে যেখানে অগ্রহায়ণের শুরুতে ধান কাটা হতো, এখন আগাম জাতের কারণে এক থেকে দেড় মাস আগেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে। বর্ষার শেষ দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার আমনের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। চলতি মৌসুমে মাঠে ব্রি ধান-৩৩, ৫৬, ৬২ ও ৭২, বিনা-৭ এর পাশাপাশি ভারতীয় জাতের গুটি পারি ও স্বর্ণা পারি ধান চাষ হয়েছে। পুরোনো জাতের আমন ধানে বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ মণ ফলন পাওয়া গেলেও, আগাম জাতের ধানে মিলছে ১৫ থেকে ২০ মণ পর্যন্ত।

শুধু ধান নয়, গো-খাদ্যের চাহিদা থাকায় কাঁচা খড় বিক্রি করেও ভালো আয় করছেন কৃষকরা। এক বিঘা জমির ধান কেটে মাড়াইয়ের পর কাঁচা খড় বাজারে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত জমি প্রস্তুত করছেন কৃষকরা। কিছুদিনের মধ্যেই এসব জমিতে আগাম আলু, সরিষা, গম ও বিভিন্ন শীতকালীন শাকসবজি চাষ করা হবে। এতে একই জমি থেকে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বোদা সদর ইউনিয়নের কান্তমনি গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম দুই বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। তার জমির ধান পেকে গেছে এবং বিঘাপ্রতি ১৯ থেকে ২০ মণ ফলনের আশা করছেন তিনি। তিনি জানান, বর্ষার শেষ দিকে পোকার আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় কীটনাশক বাবদ বাড়তি খরচ হয়েছে। বর্তমানে ময়দানদিঘী বাজারে নতুন ধান প্রতিমণ ১,১০০ থেকে ১,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ধানের দাম মণপ্রতি ১,৫০০ টাকা হলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হতেন। ধান তোলার পর তিনি এই জমিতে আলু ও শাকসবজি চাষের পরিকল্পনা করছেন।

পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন জানান, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও অর্জিত হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ৩ লাখ ৬১ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, নতুন ধান বাজারে আসায় শুরুতে দাম কিছুটা কম থাকলেও, পুরোমাত্রায় ধান কাটা শুরু হলে এবং মিলাররা বাজারে সক্রিয় হলে দাম আরও বাড়বে।