ফরিদপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সেনাসদস্য তিতাসের দাফন
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
জেলা প্রতিনিধি

দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী সাহসী সেনাসদস্য তিতাস শেখের (২৭) লাশ সামরিক হেলিকপ্টারে করে তার নিজ জন্মভূমি ফরিদপুরের নগরকান্দায় এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হয়েছে। টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারানো এই বীর সেনার দাফনকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারে তিন সদস্যই সেনাসদস্য হওয়ার পরও একটি বুলেট কীভাবে পুরো পরিবারকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, তা এখন লস্করদিয়া গ্রামের প্রতিটি মানুষের চোখে জল এনে দিচ্ছে। গতকাল বিকাল পাঁচটার দিকে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ সামরিক হেলিকপ্টারে করে শহীদ তিতাস শেখের লাশ নগরকান্দার মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে পৌঁছায়। সেখানে পদ্মা সেনানিবাস ক্যাম্পের ১৫ আরই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মেজর সোহেল আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল লাশ গ্রহণ করে। এরপর বিকাল ৫টার দিকে গাড়িতে করে মরদেহটি লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে লাশ নামানোর পরপরই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সন্তানের কফিনবন্দী মরদেহ দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বাকরুদ্ধ বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য আফজাল শেখ এবং শোকে পাগলপ্রায় মা রেখা বেগম। ওই বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে তার মরদেহ সরাসরি কবরস্থানে নেওয়া হয়। তবে কবরস্থানে নেওয়ার পথে তিতাসের বাড়ির পাশের মোড়ে পরিবার ও স্বজনদের শেষ দেখার জন্য রাখা হয়। সেখানে তিতাসের বাবা-মা, স্ত্রীসহ স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম সামদানি আজাদ, সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিতাসের লাশ কবরস্থানে নেওয়া হয়। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে লস্করদিয়া পশ্চিমপাড়া কবরস্থানে তাকে নানির কবরের পাশে দাফন করা হয়। দাফনের পর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ অকুতোভয় সৈনিককে শেষ বিদায়ের গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে সমাধিতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
এরপর সাতজন সৈনিক তিন দফায় ২১টি গুলি ছুড়ে সেনাসদস্যকে শেষ বিদায় জানান। এভাবেই শেষ হয় নিহত সৈনিক তিতাসের শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান। সেখানে অনুষ্ঠিত জানাজার আগে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বক্তব্য দেন নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে জীবন বাজি রেখে সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং মানবপাচারকারীদের মতো অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর এই বীর সেনার আত্মত্যাগ জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। জানাজায় আরও বক্তব্য দেন- নিহতের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল তালুকদার এবং নগরকান্দা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসানসহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেন তিতাস শেখ। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত থেকে দেশের সুরক্ষায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড় ছিলেন। চার বছর আগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের সুমাইয়া আক্তারকে (২২) বিয়ে করেন তিনি। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নেওয়ার কথা ছিল। তার বাবা আফজাল শেখ অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং ছোট ভাই আকরাম হোসেনও দেশের সেবায় বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার বিকালে টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলাকালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। পরে রামু সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
