জলাভূমি সংরক্ষণে চাই বিশেষ উদ্যোগ

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মো. আরাফাত রহমান, কলাম লেখক , [email protected]

জলাভূমি বলতে বোঝায় জলা, ডোবা, প্লাবনভূমি এবং অগভীর উপকূলীয় এলাকাগুলোকে। এটি একটি অবনমিত প্রতিবেশ ব্যবস্থা যেখানে পানির স্তর সবসময়ই ভূপৃষ্ঠের প্রায় কাছাকাছি অবস্থান করে। জলাভূমিকে মোহনাজ এবং স্বাদুপানি ব্যবস্থাÑ এ দুইভাগে ভাগ করা হয়, যাদের আবার মৃত্তিকার ধরন ও উদ্ভিজ্জ প্রকৃতির ভিত্তিতে আরও উপবিভাগে ভাগ করা যায়। ধীরগতি প্রবাহ অথবা স্থির পানি দ্বারা জলাভূমি বৈশিষ্ট্যম-িত এবং এ পানিরাশি বন্যজলজ প্রাণীজগতের জন্য একটি মুক্ত আবাসস্থল।

রামসার কনভেনশন-১৯৭১ অনুযায়ী জলাভূমির সংজ্ঞা হচ্ছে ‘প্রাকৃতিক অথবা মানবসৃষ্ট, স্থায়ী অথবা অস্থায়ী, স্থির অথবা প্রবাহমান পানিরাশি বিশিষ্ট স্বাদু, লবণাক্ত অথবা মিশ্র পানি বিশিষ্ট জলা, ডোবা, পিটভূমি অথবা পানিসমৃদ্ধ এলাকা এবং সেসঙ্গে এমন গভীরতা বিশিষ্ট সামুদ্রিক এলাকা যা নিম্ন জোয়ারের সময় ৬ মিটারের বেশি গভীরতা অতিক্রম করে না।’ জলাভূমির রামসার সংজ্ঞাটি বিস্তৃত পরিসরে স্বাদুপানি, উপকূলীয় এবং সামুদ্রিক পরিবেশকে একত্রে উপস্থাপন করে।

জীবতাত্ত্বিক ও ভৌত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শ্রেণির জলাভূমি শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি শ্রেণি প্রাকৃতিক এবং ৯টি মানবসৃষ্ট। বাংলাদেশের জলাভূমিগুলোকে জলতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, ভূপ্রকৃতি এবং প্রতিবেশগত ক্রিয়াকলাপের ওপর ভিত্তি করে শ্রেণিবিন্যাস করা যায় :

১. নোনাপানির জলাভূমি : ক) সামুদ্রিক জলাভূমি: নিম্ন জোয়ার-ভাটার সময় স্থায়ী অগভীর পানিরাশি, উদাহরণস্বরূপ : উপসাগর প্রবাল প্রাচীর, সেন্টমার্টিন প্রবাল প্রাচীর, খ) মোহনাজ জলাভূমি : পরিমিত উদ্ভিজ্জবিশিষ্ট আন্তঃজোয়ার ভাটা সৃষ্ট কাদা, বালু অথবা লবণাক্ত সমতল, যেমন: নতুন জেগে ওঠা ভূমি আন্তঃজোয়ার ভাটা সৃষ্ট জলাগুলো আন্তঃজোয়ার ভাটা সৃষ্ট বনাচ্ছাদিত জলাভূমিগুলো, স্রোতজ গরান বনভূমিও এর অন্তর্ভুক্ত; যেমন: সুন্দরবন, গ) লবণাক্ত হ্রদীয় জলাভূমি : স্বাদু-লবণাক্ত থেকে লবণাক্ত হ্রদগুলো যা সংকীর্ণ পথে সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত।

২. স্বাদুপানির জলাভূমি : ক) নদীজ জলাভূমি : স্থায়ী নদনদী ও স্রোতস্বিনীগুলো এবং কতিপয় চরাভূমিও এর অন্তর্ভুক্ত অস্থায়ী মৌসুমী নদনদী ও স্রোতস্বিনীগুলো, খ) হ্রদজ বা বিল জলাভূমি : বাংলাদেশে বিভিন্ন আকৃতির হাজারো হ্রদ রয়েছে। এদের বেশিরভাগই প্রধান বদ্বীপীয় অঞ্চলের রাজশাহী, পাবনা, খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও সিলেট জেলায় অবস্থিত, গ) প্যালাসট্রাইন জলাভূমি : উন্মেষরত উদ্ভিজ্জবিশিষ্ট স্থায়ী স্বাদুপানির জলা ও জলমগ্ন ভূমিগুলো, পিটগঠনকারী স্থায়ী স্বাদুপানির জলমগ্ন ভূমিগুলো, স্বাদুপানির জলমগ্ন বনভূমি যেমন : নিচু ভূমির হিজল বন।

৩. মানবসৃষ্ট জলাভূমি : মৎস্যচাষের পুকুরগুলো, সেচকৃত জমি ও সেচ খালসগুলো, লবণচাষের ক্ষেত্র, জল-বাঁধ যেমন : কাপ্তাই লেক। কৃষিভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা জলাভূমির সংজ্ঞায় ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকেন। প্লাবন বা বন্যার স্থায়িত্ব ও গভীরতার ওপর ভিত্তি করে সমগ্র দেশকে ছয়টি বৃহৎ ভূমি ধরনে বিভক্ত করা হয়েছে: উঁচুভূমি, মধ্যম উঁচুভূমি, মধ্যম নিম্নভূমি, নিম্নভূমি, অতি নিম্নভূমি এবং তলদেশীয় ভূমি। এ ভূমি শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যে জলমগ্ন মাটির মধ্যম নিম্নভূমি থেকে তলদেশীয় ভূমি পর্যন্ত এলাকাগুলোকে জলাভূমি বলে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী, স্রোতস্বিনী, স্বাদুপানির হ্রদ ও জলা, হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, জলাধার, মাছ চাষের পুকুর, প্লাবিত কৃষিজমি এবং বিস্তৃত স্রোতজ গরান বনভূমিসহ মোহনাজ ব্যবস্থা সমন্বয়ে জলাভূমির এক বিশাল ভা-ার।

তবে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক উৎসের জলাভূমি বাংলাদেশে কম গুরুত্বপূর্ণ। নদীজ উৎসের হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিল প্রভৃতিকে সাধারণভাবে স্বাদুপানির জলাভূমি নামে আখ্যায়িত করা হয়। এসব স্বাদুপানির জলাভূমি চারটি ভূদৃশ্যগত এককজুড়ে বিস্তৃত-প্লাবনভূমি, স্বাদুপানির জলাগুলো, হ্রদগুলো ও জলমগ্ন বনভূমি। মানবসৃষ্ট জলাভূমিগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম হ্রদ, দিঘি, পুকুর ও ডোবা।

ভূসংস্থানের নিম্নতর প্রান্তে অবস্থিত জলাভূমিগুলো বর্ষা ঋতুতে অগভীর থেকে গভীর প্লাবন ও বন্যা দ্বারা প্লাবিত হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ও জলতত্ত্ব-এর ওপর ভিত্তি করে একটি হাওরকে তিনটি অংশে বিভক্ত করা যেতে পারে: পর্বত পাদদেশীয় অংশ, প্লাবনভূমি ও গভীরভাবে প্লাবিত এলাকা।

বাংলাদেশের জলাভূমিগুলোর ব্যাপক বিস্তৃত প্রতিবেশগত, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং মূল্য রয়েছে। স্থানীয়, জাতীয় ও আঞ্চলিক তাৎপর্য বহনকারী এসব জলাভূমি জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল। বাংলাদেশের জলাভূমিগুলো মানব বসতি, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য উৎপাদন, কৃষি বহুমুখীকরণ, নৌ-চলাচল ও যোগাযোগ এবং প্রতিবেশ-পর্যটন প্রভৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৫ হাজারেরও অধিক সপুস্পক উদ্ভিদ এবং ১ হাজার ৫০০ প্রজাতির মেরুদ-ী প্রাণী যাদের মধ্যে প্রায় ৭৫০ প্রজাতির পাখি এবং ৫০০ প্রজাতির উপকূলীয় মোহনা এলাকার ও স্বাদুপানির মাছ বাংলাদেশের জলাভূমি এলাকাগুলোতে পাওয়া যায়।

৪০০ প্রজাতির মেরুদ-ী প্রাণী এবং প্রায় ৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদ তাদের জীবনকালের সমগ্র অংশ অথবা আংশিক সময়কালের জন্য জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল থাকে। বাংলাদেশের জলাভূমিগুলোতে প্রায় ২৬০ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ পাওয়া যায়। স্বাদুপানির মৎস্য আহরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবিকা এবং সে সঙ্গে প্রাণীজ আমিষের অন্যতম জোগানদাতা হচ্ছে এ স্বাদুপানির মাছ।

সব জলাভূমিতেই জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ কর্দম মৃত্তিকার সঞ্চয়ন ঘটে এবং জলাবদ্ধতা ও প্লাবনসহ ক্ষমতাসম্পন্ন শস্যাদি জলাভূমির বিস্তৃত এলাকায় জন্মে থাকে।

বিগত তিন দশকে জলাভূমি তথা প্লাবনভূমি ও হাওর এলাকায় রাস্তাঘাট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রভৃতি ব্যাপক ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। অধিকাংশ উন্নয়ন কর্মকা-ের বেলাতেই স্থানীয় ভূসংস্থানিক অবস্থা এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করায় নিম্নমানের নিষ্কাশন ব্যবস্থা তথা জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে এবং স্থানীয় ভূপৃষ্ঠ জলরাশিতেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ ধরনের উন্নয়ন কর্মকা- অতিদ্রুত ব্যাপক মাত্রায় জলাভূমির রূপান্তর সাধন করছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প-এর অধীনে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র প্লাবনভূমি এলাকায় প্রায় ২১ লাখ হেক্টর জলাভূমির বিলুপ্তি ঘটেছে। জলাভূমিগুলোতে মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে দেশের প্রতিবেশ ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে এবং জলাভূমির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় সমভূমির স্বাদু লবণাক্ত পানিসমৃদ্ধ জমিতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের ফলে জমির ঊর্ধ্ব লবণস্তর অপসারিত হলে কৃষকরা ধান চাষ করত, আর বছরের বাকি সময় সে জমিকে পশুচারণের জন্য পতিত রাখত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ চাষাবাদ ব্যবস্থা চলে আসছিল। কিন্তু বিগত দু’দশক যাবত চাষাবাদের এ চর্চা পরিত্যক্ত হয়ে তার পরিবর্তে অধিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। এর ফলে, পরিবর্তিত পানি বিনিময় ব্যবস্থা, নদী খাতগুলো পলি সঞ্চয়ন এবং প্রতিনিয়ত লবণাক্ত পানি দিয়ে জমি প্লাবিত করার ফলে স্থানীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

হাওর এলাকাগুলোতে চতুপার্শ্বস্থ ঘনবসতি এলাকা থেকে লোকজন এসে বসতি গড়ে তুলছে এবং ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। অব্যাহতভাবে ব্যাপক মাত্রায় জলজউদ্ভিদ ও ফলমূল, যেমন : মাকনা, সিঙ্গারা, পদ্ম, শাপলা, হোগলা প্রভৃতি আহরণের ফলে হাওর এলাকার মাছ ও অতিথি পাখির আবাসের জন্য প্রয়োজনীয় এসব উদ্ভিদের পরিমাণ ও গুণাগুণ দুইই মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। একইভাবে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের জন্য নির্মিত বাঁধগুলো একদিকে যেমন প্লাবনভূমি হ্রাস করছে তেমনি আবার খাদ্য সংগ্রহ ও পোনা ছাড়ার জন্য নদী থেকে বিভিন্ন বিল ও প্লাবনভূমিতে চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ফলে বহু জেলে তাদের জীবিকা ত্যাগে বাধ্য হচ্ছে।

জলাভূমি রূপান্তরের কিছু ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। প্রধান প্রভাব হচ্ছে চাষাবাদের ধরনের ওপর। এর ফলে স্থানীয় বোরো ধানের ওপর নির্ভরতা কমে উচ্চ ফলনশীল বোরো ধানের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্প এলাকাগুলোতে মাছ চাষ প্রাকৃতিক মৎস্য আহরণ ঘাটতিকে পূরণে সহায়তা করছে। জলাভূমি এলাকাগুলো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় উন্নত সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপণন অবকাঠামোকে উন্নত করেছে এবং সামাজিক ও অন্যান্য সেবাগুলো তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য হয়েছে। বিপরীতক্রমে, নৌপরিবহন ব্যবস্থা হয় বন্ধ হয়ে গিয়েছে অথবা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে।

জলাভূমিগুলোর ক্রমাবনতি বহু সমস্যার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ পাখি ও সরীসৃপসহ বেশকিছু বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হওয়া বা আশঙ্কাজনকহারে কমে যাওয়া, অনেক প্রকার দেশীয় ধানের প্রকারভেদের বিলুপ্তি, বহু ধরনের দেশীয় জলজ উদ্ভিদ, বীরুৎ, গুল্ম ও নলখাগড়ার ধ্বংস সাধন, মাটির প্রাকৃতিক পুষ্টি হ্রাস, প্রাকৃতিক জলাশয় ও তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপকারিতা হারিয়ে যাওয়া, বন্যার সংঘটন বৃদ্ধি পাওয়া, জলাভূমিভিত্তিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার ধ্বংস সাধন এবং আর্থসামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতির বিলুপ্তি এবং সর্বোপরি মানুষের জীবিকার পথরুদ্ধ হয়ে যাওয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলাভূমির গতিশীল প্রতিবেশ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে থাকে। তবে মানবীয় কর্মকা-ের মাধ্যমে জলাভূমির যে কোনো ধরনের পরিবর্তন অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত করতে হবে।