ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালির জাতীয়বাদী চেতনার মূল উৎস
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ড. মো. খোরশেদ আলম , শিক্ষক ও চেয়ারম্যান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ,[email protected]

সবুজ-শ্যামল আবহমান বাংলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য বিশ্বনন্দিত। প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ জনপদের প্রতি বরাবরই ছিল ভিনদেশি শাসক-শোষকের লোলুপ দৃষ্টি। আর্য-দ্রাবিড়-রাঢ়-মৌর্য-তুর্কি-পাঠান-মোগল-ইংরেজ-পাকিস্তানসহ সব ঔপনিবেশিক আমলেই লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে বাংলার এ জনপদ। একই সঙ্গে বিদেশি বণিকদের আকৃষ্ট করার মতো বিচিত্র ও মূল্যবান পণ্যসামগ্রীর সমারোহে বাংলার প্রকৃতি ছিল অতুলনীয়। ১৭ শতকের এ বাংলা সম্পর্কে ফরাসি ইতিহাসবিদ ফ্রান্সিস বার্নিয়ার বলেছিলেন, বিশ্বের সর্বাপেক্ষা মনোরম ও সুফলা দেশ হিসেবে মিশরকে বর্ণিত করা হলেও বিষয়টি আসলে প্রাপ্য ছিল এ বাংলার।
দীর্ঘদিনের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মাতৃভূমি মুক্তির লক্ষ্যে সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছিল মহান ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে রাজপথ ভিজেছিল শহীদদের রক্ত ও প্রাণ বিসর্জনে। বাঙালি জাতির মুক্তির মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চিরন্তন চেতনার শুরুটা ছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি।
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?’ না, আমরা একুশে ফেব্রুয়ারিকে কিছুতেই ভুলতে পারি না। একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের স্মারক হিসেবে আমাদের আবেগকে এতটাই নিয়ন্ত্রণ করে যে, সে ভাষা আন্দোলনকে উপলক্ষ্য করে আমরা একুশেকে স্মরণ করি, সেই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসটাও আমরা সঠিকভাবে জানার গুরুত্ব অনুভব করি না আবেগের আতিশয্যে। অথচ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, তার পটভূমি ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য আমাদের সঠিকভাবে জানা প্রয়োজন বাংলাদেশ নামের আমাদের আজকের প্রিয় স্বাধীন-সার্বভৌম মাতৃভূমির অভ্যুদয়ের ইতিহাস জানার স্বার্থেই। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। সুতরাং স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস জানতে হলে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানার কোনো বিকল্প নেই।
আজকের লেখা শুরু করছি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভাষা আন্দোলনের অবদানের গুরুত্ব বিশ্লেষণের মাধ্যমে। ইতিহাসবিদরা এ কথা স্বীকার করবেন যে, পলাশীতে আমাদের স্বাধীনতা সূর্য অস্ত গেলেও কালক্রমে সমগ্র উপমহাদেশই ইংরেজদের পদানত হয়। দীর্ঘ ইংরেজ শাসনের সেই পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে আমরা প্রথম মুক্তি পাই ১৯৪৭ সালে। রাজনৈতিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল ভারত নামে এবং মসুলিম অধ্যুষিত পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল পাকিস্তান নামের দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালে যে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ইংরেজবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল তার একটি ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, অপরটি ছিল নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। প্রথমটির দাবি ছিল, সমগ্র ভারতবর্ষকে অখ- স্বাধীন হবে। দ্বিতীয়টির দাবি ছিল, উপমহাদেশকে হিন্দু অধ্যুষিত ও মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন হতে হবে। সেই আলোকে আজকের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি সাময়িকভাবে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। হাজার মাইলের দূরের বিচ্ছিন্ন দুটি ভৌগোলিক অঞ্চল নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে অনেকটা বিরলই বটে। পাকিস্তান আন্দোলনের মূল ভিত্তি ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবেও পাকিস্তানের দুটি অঞ্চলে দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হবে বলে উল্লিখিত হয়েছিল। তবে ১৯৪৬ সালে দিল্লি সম্মেলন লাহোর প্রস্তাব আংশিক সংশোধন করে আপাতত দুই অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তবে দিল্লি সম্মেলনে মূল প্রস্তাব উত্থাপনকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার প্রস্তাব উত্থাপনের সময়ে বক্তব্যের একপর্যায়ে বলেন, অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছেন, পাকিস্তানই আমার চূড়ান্ত দাবি কি-না। এ প্রশ্নের কোনো জবাব আমি দেব না। তবে এ কথা অবশ্যই বলব, এ মুহূর্তে পাকিস্তানই আমার প্রধান দাবি। অর্থাৎ পরবর্তীকালে উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তিনি বাতিল করে দিলেন না।
নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছিল ভারত ভাগের আগেই। অবাঙালি মুসলিম রাজনীতিবিদ ও অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবীরা বলছিলেন উর্দু ভাষার কথাÑ অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ ও এনামুল হকের মতো বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা এর প্রতিবাদ করছিলেন। সে সময় ছোট-বড় অনেক রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন, শিক্ষাবিদরা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে কথা বলতে শুরু করেছিলেন। ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে স্বাধীন ভারতে যে হিন্দি রাষ্ট্রভাষা হবে, সে ব্যাপারে কংগ্রেস আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; কিন্তু পাকিস্তানের ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই পাকিস্তানের জন্ম হয়।
ভারতবর্ষ অখ-ভাবে স্বাধীন না হয়েও যেভাবে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তাতেও দেখা যায়, সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ নাগরিক বাংলা ভাষাভাষী। অথচ পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ অফিসারদের সিংহভাগ উর্দুভাষী হওয়ায় কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না হওয়া সত্ত্বেও গোপনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার একটা গোপন চেষ্টা চলতে থাকে। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও অধ্যাপক মিলে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই তমদ্দুন মজলিস নামে একটি সংগঠন সৃষ্টি করেন, যারা শুরু থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে নানারকম সভা-সমিতি-আলোচনার আয়োজন করে। গঠিত হয়েছিল একটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদও। এর নেতারা ১৯৪৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের শিক্ষমন্ত্রী ফজলুর রহমানের সঙ্গে এক বৈঠক করে ডাকটিকিট-মুদ্রা ইত্যাদিতে বাংলা না থাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ফজলুর রহমান তাদের আশ্বাস দেন যে, এগুলো ঘটেছে নিতান্ত ভুলবশত। ঢাকায় ১৯৪৭-এর ৫ ডিসেম্বর বর্ধমান হাউসে (বর্তমান বাংলা একাডেমি ভবন) বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে প্রস্তাব নেওয়া হয়, উর্দুকে পূর্ব বাংলার সরকারি ভাষা করা হবে না। এ বৈঠকের সময় বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ভবনের সামনে বিক্ষোভও করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ৬-৭ মাস পর জিন্নাহ যখন ঢাকায় আসেন, তখনই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রীতিমতো উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন।
উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাবার্তা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ববঙ্গের ছাত্র, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ, বুদ্ধিজীবী আর রাজনীতিবিদরা বুঝেছিলেন, এটা বাঙালিদের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। তারা বুঝলেন, এর ফলে পাকিস্তানে উর্দুভাষীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, বাঙালিরা সরকার ও সামরিক বাহিনীতে চাকরি-বাকরির সুযোগের ক্ষেত্রে উর্দু-জানা জনগোষ্ঠীর তুলনায় পিছিয়ে পড়বেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে বাঙালি মুসলমানদের উন্নয়ন ও সামাজিক বিকাশের যে স্বপ্ন সৃষ্টি হয়েছিল, তা চরমভাবে ব্যাহত হবে। অথচ পাকিস্তানের বাস্তবতা ছিল এই যে, সে দেশের পূর্বাংশে এবং গোটা দেশ মিলিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাই ছিল বাংলা। পশ্চিম পাকিস্তানে ৪০ শতাংশের কিছু বেশি লোকের ভাষা ছিল পাঞ্জাবী, আর মাত্র চার শতাংশের ভাষা ছিল উর্দু। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা হয়েও বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে না এটা পূর্ববঙ্গের ছাত্র ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচ- ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামের যে ছাত্র সংস্থা গঠিত হয়, সেটি গোড়া থেকেই তমদ্দুন মজলিস সূচিত ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। ছাত্রলীগ ভাষা আন্দোলনে যোগদানের পর তমদ্দুন মজলিস ও ছাত্রলীগের যুগপৎ সদস্য শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ভাষা আন্দোলনের শুরুতে তমদ্দুন মজলিসের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত কার্যক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অংশগ্রহণ করেন। এই মজলিসকে রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বহুকাজে সক্রিয়ভাবে সাহায্য, সমর্থন ও নেতৃত্বদান করেন।
আন্দোলন চলাকালে জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান প্রমুখ নেতৃবৃন্দের মৃত্যু হলে নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঢাকা সফরে এসে নাজিমুদ্দিন এক জনসভায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হবে বলে ঘোষণা দিলে জনগণ একে বিশ্বাসঘাতকতা বিবেচনা করে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ দিবসের কর্মসূচি বানচালের লক্ষ্যে ঢাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ভাষা আন্দোলনের ন্যায্য দাবিকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাংলা ভাষার দাবি জানিয়ে কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের গুলিবর্ষণে বরকত, সালাম, জব্বার প্রমুখ। ভাষাশহীদরা বুকের রক্ত দিয়ে মাতৃভাষা বাংলার দাবি প্রতিষ্ঠা করে যান। এরপর কারও পক্ষে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে কথা বলার আর সাহস হয়নি। এরপর পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় হয়।
১৯৫৬ সালে বাংলা তো পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হয়ে গেল; কিন্তু বাঙালির আন্দোলন তো থামল না। অর্থনীতি, বাজেট বরাদ্দ, সরকারি চাকরির সুযোগ, রাজস্ব ও কর এরকম সব ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাধান্য আর পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করার বিষয়টি রাজনীতিতে প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৬ দফা দিলেনÑ কারণ আমাদের মূল দ্বন্দ্বটা ছিল অর্থনৈতিক। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে আন্দোলনটাকে মানুষের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি ১৯৪০-এর দশক থেকে রাজনীতি করছেন, তাই বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তার পূর্ণ ধারণা ছিল। তার ৬ দফার ধারণা মূলত বাঙালি জাতির আকাক্সক্ষার সঙ্গে মিলে যায়।
৬ দফার ভিত্তিতে ৭ কোটি বাঙালিকে একসুরে, এককাতারে এনে আন্দোলন-সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে চলতে থাকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে সেই স্বাধিকার চেতনারই জয় হয়। জনগণের সে ন্যায্য দাবিকে স্বীকৃতিদানের বদলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জনগণের স্বাধিকার চেতনাকে নস্যাৎ করে দিতে উদ্যত হলে বীর বাঙালি জীবন-মরণ সংগ্রাম করে ৯ মাসের সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। এভাবেই ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিকে একক রাজনৈতিক মঞ্চে নিয়ে আসে এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতন করে তোলে। এভাবেই অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি, সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে নতুন পরিম-লে নিয়ে যায়। বাঙালি জাতির পরবর্তীকালে সংঘটিত সব আন্দোলনের প্রেরণা আসে ভাষা আন্দোলন থেকে। ভাষা আন্দোলনের শিক্ষাই বাঙালিকে জাতিকে স্বাধিকার আন্দোলনে দীক্ষিত করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামে প্রেরণা জোগায়। সুতরাং বলা যায়, ভাষা আন্দোলনের ফলেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাবোধের বিকাশ ঘটে, প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
