ঢাকা রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মতামত

ফেইসবুকে নয়, বাস্তবে ভালো কাজ করি

ফেইসবুকে নয়, বাস্তবে ভালো কাজ করি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমরা সহজে যেটাকে ফেইসবুক বলি। মাঝেমধ্যে এ ফেইসবুক জগৎটাকে বেশ অদ্ভুত এবং মারাত্মক হাস্যকর মনে হয়। প্রতিনিয়ত চোখ কপালে ওঠে যায়, অবাক হওয়ার মতো কা- ঘটে ফেইসবুকে। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, এই মাধ্যমটা ব্যবহার করছে না এমন মানুষ খুব কম।

আমাদের সমাজেরই চোর, ডাকাত, খুনি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, ধর্ষক, দুর্নীতিবাজ, গুটিবাজ, নেশাখোর, প্রতারক, মলমপার্টি, অপহরণকারী, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী, জুয়াড়ি, বেঈমান, মিথ্যাবাদী এবং যত নোংরা মানুষ আছে তারা সবাই কিন্তু ফেইসবুক চালায়। তাদের মধ্যে কত বৈচিত্র্য, সেটা অফলাইনে আর অনলাইনে বোঝা যায়। ফেইসবুকে সবাই ভালো, সৎ এবং সততার পোস্ট দেয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, নিজেও সৎ এবং সুন্দর মনের মানুষ সেটার গান গায়। আর সেখানে আরও কিছু ভালো-মন্দ মানুষ সহমত, শুভ কামনা কিংবা অভিনন্দন লিখে কমেন্ট করে।

কিন্তু বাস্তবে আর ফেইসবুকে তাদের কালচার আচরণ এবং বৈশিষ্ট্য দেখে বড়ই অবাক লাগে। ফেইসবুকে নীতি গল্প আর ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে বেড়াবে আর বাস্তবে নিজেই সেসব নীতি গল্প আর ধর্মীয় শিক্ষাবিরোধী কাজ করবে। এটা যে কত বৈচিত্র্য, সেটা অফলাইনে আর অনলাইনে বোঝা যায়। অনলাইনে যতটা সহজে ত্যাগ, দয়া, মনুষ্যত্ব ভেসে ওঠে, তাদের পোস্টে বাস্তবে ঠিক ততটাই হিংস্র, অমানবিক হয় তাদের আচরণ। প্রকৃতপক্ষে কে কতটা ভালো, সেটা ফেইসবুকে কখনও বিচার করা সম্ভব নয়।

প্রোফাইলে আল্লাহ লেখা ছবি ঝুলিয়ে সারাদিন ইউটিউবে অশ্লীল ভিডিও দেখা পাবলিককে আপনি কী বলবেন? কীভাবে বুঝবেন সে মন্দ না ভালো লোক? আর আমরা এটা বুঝতেও চাই না। যেহেতু সে আল্লাহ লেখা ছবি প্রোফাইলে রেখেছে, সেহেতু সে ধার্মীক, সৎ এবং ভালো মানুষ। আমরা এমনই ভাবি।

প্রোফাইল দেখে কিংবা পোস্ট পড়ে এখন খারাপ বলতে পারেন না কাউকে। কারণ আপনি তো খারাপ কিছু দেখছেন না। এই যেমন রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যন প্রতারক সাহেদ, সে তো বিভিন্ন টিভিতে মোটিভেশনাল কথাও বলেছে। আবার সেগুলো তার পেইজ এবং আইডিতে শেয়ারও করেছে। কিন্তু সে যে একজন ভ--প্রতারক সেটা কি কেউ জানতাম? জানতাম না। এভাবেই আমাদের চারপাশে অসংখ্য ভ--প্রতারক রয়েছে, যা আমরা নিজেরাই জানি না। কিন্তু আমরা চোখের পলকেই এসব ভ- সম্পর্কে না জেনেই তাদের মাথায় তুলে ফেলি।

মূল কথা হচ্ছে, আমরা সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালো, সৎ, ঈমানদার, সত্যবাদী, ন্যায় ব্যক্তি। হক কথাগুলো সবাই ফেইসবুকেই বলি। আপনি আরও ভালোভাবে গবেষণা করতে চাইলে আপনার জানা কিছু অসৎ, নোংরা মানুষের ফেইসবুক আইডি সংগ্রহ করুন। আর তাদের প্রোফাইলে ঘুরে আসুন। দেখবেন আপনার সব মনের কথাগুলোই তিনি বলেছেন। পার্থক্য একটাই। তার লেখার সঙ্গে তার বাস্তব চরিত্রের কোনোদিক থেকেই মিল পাবেন না।

আজ থেকে বছর খানেক আগের ঘটনা। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ফেইসবুক পেইজে সামান্য সমস্যা হওয়াতে একটা পোস্ট করেছিল। সমস্যা সমাধান করতে পারবে বলে একজন ভদ্রলোক আমার বন্ধুকে কমেন্ট করলে আমার বন্ধু তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর ওই ভদ্রলোককে এডমিন করেছিল সমস্যার সমাধানে। ভদ্রলোক এডমিন হওয়ার পর যা করল তা নিশ্চই আপনারা অনুমান করতে পারছেন। হ্যাঁ, আমার বন্ধুকে পেইজ থেকে বের করে দেয় এবং ব্লক করে দেয় ফেইসবুকে। ভাবছেন এ লোকটিকে কেন ভদ্রলোক বলছি? কারণ তার প্রোফাইলে ঘুরে এলে তাকে কোনোভাবেই অভদ্র মনে হবে না। যাহোক, ভদ্রলোকটি ওই পেইজ বিক্রি করবেন ১ হাজার টাকা দিয়ে। এ ধরনের একটি পোস্ট তিনি পেইজটিতে করেন। এরপর আমার বন্ধু আমাকে বিষয়টি বলে। আমি তখন তাকে ১ হাজার টাকা দিয়ে পেইজ কিনতে বললাম। সে বলেছে, আমি যেন কিনে দিই। যদিও এ ধরনের কাজে বিশ্বাস ছাড়া কখনও হয় না। তাই বিশ্বাস করেই সামনে এগুলাম। ভাবলাম, লোকটি হয়তো টাকার জন্য এসব করেছেন। আর আমার বন্ধুরও পেইজটি দরকার। তাই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলি। কথা ফাইনাল করে টাকাও পাঠাই। বিকাশে যে টাকা পাঠিয়েছি তার স্ক্রিনশর্টও দিলাম ভদ্রলোকের ইনবক্সে।

এরপরের ঘটনা আর বলতে ইচ্ছে করছে না। মানুষ কতটা নোংরা হতে পারে, কতটা প্রতারক হতে পারে সেদিন বুঝলাম। নিজের প্রতি একটু রাগ হচ্ছে। চিনতে পারলাম না একজন প্রতারককে। আর কীভাবেই চিনব। ওই যে বললাম, ফেইসবুক দেখে আসলেই বোঝাই যায় না, কে ভদ্র আর কে অভদ্র। লোকটার প্রোফাইলের শুরুতেই লেখা আছে, অনেস্ট ইজ দ্য বেস্ট পলেসি। বুঝলাম মানুষ কতটা সৎ হয়ে প্রতারক হতে পারে। এরকম আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটনা ঘটছে। যার ব্যক্তিত্ব তার ফেইসবুক দেখে বুঝতে পারবেন না।

রঙিন এই ফেইসবুকে এরকম অহরহ আজব আজব পোস্ট দেখি, যা ফেইসবুকের চেয়ে বেশি রঙিন। আর ফেইসবুকের পোস্টগুলো এতটাই রঙিন যে, কে ভালো আর কে মন্দ সেটা বোঝার কোনো উপায় থাকে না। তাই আজ ফেইসবুকের রং মেখে সবাই এই জগতে সৎ এবং সত্যবাদী। ধরা খেলে প্রতারক।

‘ফেইসবুকে সততাই সব সুখের মুল’ লিখে পোস্ট দেওয়া লোকটাই; কিন্তু অন্যজনের টাকা আত্মসাৎ করে ঘুমোতে যায়। সারারাত নেশা করে ঘুমানোর আগে পোস্ট দিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া ছেলেটার পোস্ট হয় এমন, ‘ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম।’ যার দিনটা যায় মিথ্যা বলতে বলতে, সেও অনলাইন এসে লিখে দেয়, ‘সত্যের জয়, হবে নিশ্চয়ই’। সারারাত পর্নোগ্রাফি দেখা ছেলেটাও পোস্ট দিয়ে বলে, ‘সমাজটা নোংরামিতে ডুবে গেছে’। দিনভর ঘুষ নেওয়া লোকটা বলে, আল্লাহর রহমতে বেশ ভালো আছি। মনের ভেতর একরাশ হিংসা আর অহংকার রাখা লোকটা মাঝেমধ্যে কমেন্ট করে বলে, ‘এগিয়ে যাও’। নারীর দিকে লোভাতুর চোখে তাকানো লোকটা পোস্ট দেয়, ‘নারী আমাদের মায়ের জাতি’। কপি করে পোস্ট দেওয়া ছেলেটাও মাঝেমধ্যে মদ খেয়ে খেয়ে ইসলামিক পেইজ থেকে কপি করে পোস্ট দেয়, ‘মদ খাওয়া হারাম’। পরপুরুষের সঙ্গে রাত জেগে অশ্লীল কথা বলা মেয়েটাও ফেইসবুকে লিখে, ‘আমি আমার হবু স্বামীর জন্য সম্পদ’। পরকীয়ায় জড়িত নারীটাও লিখে, ‘আমার স্বামী আমার বেহেশত’। নিয়মিত প্রচুর টাকা-পয়সা খরচ করে শৌখিনভাবে চলাফেরা করা ছেলেটাও মাঝেমধ্যে লিখে, ‘সাধারণ জীবনযাপন ভালো লাগে’। অন্যের ওপর জুলুম করা লোকটা অনলাইনে এসে বলে, ‘মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগে’। যে মেয়েটার প্রোফাইল পিক নগ্ন, সে মেয়েটা আবার পোস্ট দেয়, ‘ছেলেরা এত নোংরা হয় কীভাবে?’। ঘুষখোর লোকটিও সারাদিন অবৈধ পথে আয় করে. রাতে ফেইসবুকে পোস্ট দেয়, ‘আল্লাহ আমাকে রহমত করছেন, বলে আজ আমি সবার চাইতে ভালো’।

এরকম কত ধরনের ভ- অনলাইনে আছে সেটা আপনি আমি আমরা কেউই জানি না। হয়তো এরকম দু-একটা ভ- আপনার আমার আশপাশেও আছে। আমরা খালি চোখে যাদের সাধু মনে করছি, হতে পারে তারাও সেই ভ-ের কাতারে আছেন!

মনে রাখবেন, ফেইসবুক একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এটা আমাদের সবার প্রয়োজনে ব্যবহার করি। কিন্তু ফেইসবুকের মাধ্যমে কারও ব্যক্তিত্ব আপনি বুঝতে পারবেন না। কিংবা কারও ব্যক্তিত্ব যাচাই করতেও যাবেন না। তাই যেকোনো পোস্ট, লেখায় মন্তব্য করার আগে ভাববেন। বিষয়টার সঙ্গে মানুষটার কতটা যায়, সেটা বুঝতে চেষ্ট করবেন। না বুঝতে পারলেও কাউকে নিয়ে অতিমাত্রাই হইচই করবেন না। মনে রাখবেন, আপনার যাকে ফেইসবুকে ভালো লাগে সে বাস্তবে মানুষের বুকে ছুরিও চালাতে পারে। তাই বিশ্বাসটা ফেইসবুক দিয়ে করতে যাবেন না। আজকাল অনেকেই ফেইসবুকে বন্ধুত্ব, প্রেম, সম্পর্ক নানান কিছু করে বসেন। এর বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত ধোঁকা খেয়ে আত্মহত্য কিংবা মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেন। বাস্তবতা এটাই।

পরিশেষে বলতে চাই, আসুন আমরা ফেইসবুকে নয়, বাস্তবে ভালো কাজ করি, ভালো কথা বলি। ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে নয়, বাস্তবে মানুষকে সহযোগিতা করি। সবচেয়ে বড় কথাটি বলতে হয় সেটা হচ্ছেÑ আগে নিজে ভালো কাজ করি, তারপর অন্যকে বলি। নিজে কি লিখছি, কি বলছি, সেটা একটু চিন্তা করি। নিজের লেখা কথাটি নিজের সঙ্গে যায় কি-না, সেটা একটু ভেবে দেখি। তবেই আমরা ভালো হতে পারব। ভালো হতে না পারি অন্তত ভ- কিংবা মুখোশধারী হব না। মনে রাখবেন, আমাদের সমাজে সবচেয়ে ভয়ংকর এই মুখোশধারীরা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত