অপারেশন সার্চলাইট ও বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ড. এ. এইচ. এম মাহবুবুর রহমান, চেয়ারম্যান, সমাজকর্ম বিভাগ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের শিক্ষা দিতে গণহত্যার (Genocide) নির্দেশ দিয়ে সন্ধ্যায় ঢাকা ত্যাগ করে। জুলফিকার আলী ভুট্টো গণহত্যার (Genocide) দৃশ্য নিজের চোখে দেখার জন্য ঢাকা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবস্থান করে (বর্তমানে শেরাটন)। রাত ১১টার পর ঢাকা সেনানিবাস থেকে আর্মিদের ট্যাংক রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ইপিআর সদর দপ্তর (পিলখানা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করে। ঢাকা ক্যান্টনম্যান্ট থেকে সেনাবাহিনীর ট্যাংকগুলো ফার্মগেটে সাধারণ জনগণ দ্বারা প্রথম প্রতিরোধের সম্মুক্ষীণ হয়। ১২টা ২০ মি. এ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন (This may be my last messasse from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh whatever you have to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupational army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.) ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির ওপর অতর্কিতভাবে নৃশংস হত্যাকা-ে মেতে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জগন্নাথ হলের ছাত্রদের ধরে ধরে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। বস্তিতে বস্তিতে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয় নিরীহ মানুষদের। ঢাকা শহর পরিণত হয় লাশের শহরে। ঢাকা ত্যাগ করার সময় ভুট্টো বলে যায় ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, পাকিস্তানকে রক্ষা করা গেছে।’ সাংবাদিকরা যাতে গণহত্যার সংবাদ প্রচার করতে না পারে, সেজন্য সব বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বন্দি করে রাখে এবং বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সানডে টাইমস-এর সাংবাদিক আ্যন্থনি ম্যাসকারেনহাস, ডেইলি টেলিগ্রাফের সাইমন ড্রিংক, অবজারভার (লন্ডন) প্রতিবেদক কলিন্স স্মিথ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর তথ্য সংগ্রহ করে। নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক শিডনি এইচ শনবার্গ যিনি গণহত্যা প্রত্যক্ষ করে এবং ২৮ মার্চে নিউইয়র্ক-এ তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর রাত ১.৩০মি. পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে কুর্মিটোলা ও পরে পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগারে আটক রাখে। লয়ালপুর সামরিক আদালতে প্রহসনের বিচার করে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। এদিকে ১০ এপ্রিল দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় ’৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় পরিষদের সদস্যদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তাজউদ্দিন আহমদ। উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সরকারের অধীনেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ১৭ এপ্রিল। পরবর্তী সময়ে বৈদ্যনাথতলার নাম পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় ‘মুজিব নগর’। মুজিব নগর সরকার কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোড থেকে পরিচালিত হত। এজন্য এ সরকারকে ‘প্রবাসী সরকার’ ও বলা হয়। মুক্তিযুদ্ধে প্রধান সেনাপতি ছিলেন লে. (অব.) এম এ জি ওসমানী এমএনএ। চিফ অব স্টাফ ছিলেন কর্নেল (অব.) আব্দুর রব এমএনএ। উপপ্রধান ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও পরামর্শদানের জন্য একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মওলানা ভাসানী, (ন্যাপ ভাসানী), সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সদস্য (আওয়ামী লীগ), তাজউদ্দিন আহমদ, আহ্বায়ক (আওয়ামী লীগ), এম মনসুর আলী, সদস্য (আওয়ামী লীগ), এ এইচ এম কামরুজ্জামান, সদস্য (আওয়ামী লীগ) খন্দকার মোশতাক আহমদ, সদস্য (আওয়ামী লীগ), কমরেড মণি সিংহ, সদস্য (কমিউনিস্ট পার্টি), অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, সদস্য (ন্যাপ, মোজাফফর), মনোরঞ্জন ধর, সদস্য (জাতীয় কংগ্রেস)। ১৯৭১ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং ১২ জুলাই থেকে সেক্টরগুলো কাজ শুরু করে। সেক্টর ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেন, ১ নম্বর সেক্টর প্রথমে জিয়াউর রহমান পরে রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, ২ নম্বর সেক্টর মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ বীর উত্তম, ৩ নম্বর সেক্টর মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ বীর উত্তম, ৪ নম্বর সেক্টর মেজর জেনারেল সি আর দত্ত বীর উত্তম, ৫ নম্বর সেক্টর লে. জেনারেল শওকত আলী বীর উত্তম, ৬ নম্বর সেক্টর এয়ার ভাইস মার্শাল এম কে বাশার বীর উত্তম, ৭ নম্বর সেক্টর লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান বীর উত্তম, ৮ নম্বর মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর বীর উত্তম, ৯ নম্বর মেজর এম এ জলিল, ১০ নম্বর সেক্টর গঠিত হয়েছিল নৌবন্দরগুলো নিয়ে, ১১ নম্বর কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম, এসব সেক্টর ছাড়াও কিছু ফোর্স কমান্ডার ছিলেন যেমন জেড ফোর্স লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান, কে ফোর্স মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ বীর উত্তম, এস ফোর্স মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ বীর উত্তম। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ইপিআর (বিডিআর) নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনছারের সঙ্গে সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। বাঁশের লাঠি, দা, সুরকি, বল্লম এসব স্থানীয় আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র দিয়ে নারী-পুরুষ-শিশু সর্বস্তরের মানুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যুহ গড়ে তোলে। ভারতের সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সাধারণ মানুষ যারা অস্ত্র চালানো প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তারা মুক্তিবাহিনী বা মুক্তিফৌজ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ‘মুক্তিফৌজ’ শব্দটি উর্দু হওয়ায় শব্দটি ব্যবহার না করে মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি ব্যবহার করা হতো। মুক্তিবাহিনীর নাম শুনলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভয়ে চমকে উঠত। বিশেষ করে ‘গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা’ ছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারের যম। রাজাকার, আলবদর বাহিনী এইসব দুধুর্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের ‘মুক্তি’ বলে সম্ভোধন। মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে মুজিব বাহিনী (বিএলএফ), কাদেরিয়া বাহিনী (ঢাকা ও টাঙ্গাইল), আফসার বাহিনী (ভালুকা জয়দেবপুর), হালিম বাহিনী (মানিকগঞ্জ), আওরঙ্গ বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী (বরিশাল), মোতালেব বাহিনী (সুনামগঞ্জ), স্থানীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করে এবং মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার পর পরই পাকিস্তান সরকার তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্বের কারণে এদেশে ‘ইসলাম পছন্দ’ ব্যক্তিদের নিয়ে সহযোগী বাহিনী গড়ে তোলে। জামায়াতে ইসলামি, নেজামে ইসলাম, পিডিপি ও মুসলিম লীগের সমর্থক কর্মী ও বিহারী উর্দুভাষীরা বিভিন্ন বাহিনীতে যোগ দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।
শান্তি কমিটি : ৪ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি) সভাপতি নূরুল আমিনের নেতৃত্বে জেনারেল টিক্কা খানের উপদেশে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। ফরিদ আহমেদ (পিডিপি), মাওলানা নূরুজ্জামান (নেজামে ইসলাম) হামিদুল হক চৌধুরী (অবজারভার পত্রিকার মালিক) গোলাম আজম (জামাতে ইসলামি) পীর মোহসিন উদ্দিন প্রমুখ শান্তি কমিটির নেতৃত্ব দেন। শান্তি কমিটির পরিকল্পনা ও নির্দেশে রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনীর তৎপরতা পরিচালিত হত। শান্তি কমিটির মূল কাজ ছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের তালিকা প্রস্তুত করে সেনাবাহিনীকে দেওয়া, লুটতরাজ করা, অগ্নিসংযোগ, স্কুল-কলেজে পড়–য়া মেয়েদের আর্মি ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া এবং হত্যা করা। পাকিস্তানের অখ-তার নামে বাংলাদেশকে অস্বীকার করা। ১৯৭১ সালের ২৪ আগস্ট শান্তি কমিটির মূল হোতা গোলাম আজম ‘পাকিস্তানের দূষমন’দের মহল্লায় মহল্লায় তন্ন তন্ন করে খুঁজে তাদের অস্তিত্ব বিলোপ করার নির্দেশ দেয়।
রাজাকার : ১৯৭১ সালের মে মাসে জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে খুলনায় রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়। জুন মাসে ‘পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অধ্যাদেশ ১৯৭১’ জারি করে পাকিস্তান সরকার। ১৯৫৮ সালের আনসার অ্যাক্ট বাতিল করে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। রাজাকারদের তিনটি প্রধান কাজ ছিল (ক) পাকিস্তান ও ইসলাম রক্ষার স্বার্থে নির্বিচারে বাঙালি হত্যা ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। (খ) লুটপাট, চাঁদাবাজি, (তহবিল সংগ্রহ করতে), প্রতিশোধ গ্রহণ, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ করে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করা এবং (গ) সমাজের দরিদ্র শ্রেণিকে প্রলুব্ধ করে রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি করা।
আলবদর : আলবদর বাহিনীর সভাপতি ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। সংগঠক ছিলেন কামারুজ্জামান, (যোদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে) মীর কাশেম, আশরাফুজ্জামান, আশরাফ হোসেন প্রমুখ। গভর্নরের উপদেষ্টা রাওফরমান আলীর তত্ত্বাবধানে ও সেনাবাহিনীর সহায়তাকারী হিসেবে আলবদর বাহিনী গড়ে ওঠে। ছাত্র সংঘের প্রধান ছিলেন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (যোদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে)। মুজাহিদ ছিল সশস্ত্র ক্যাডার ও হিংস্র। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নির্যাতন করে হত্যায় সরাসরি কাজ করত আলবদর ও ছাত্রসংঘের ক্যাডাররা।
আল শামস্ : ছিল একটি ডেথ স্কোয়াড। আলবদর ও ছাত্রসংঘের মতোই নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও বুদ্ধিজীবী হত্যার পেছনে এ বাহিনী বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়ন, বাসায় বাসায় চিঠি পাঠানো ও গোপন তথ্য সংগ্রহ করে সেনাবাহিনীকে অবহিত করা ছিল প্রধান কাজ। মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ কর্মী ও হিন্দুদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও মালামাল লুণ্ঠন করে সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করত।
মুক্তিযুদ্ধে এসব বাহিনী ছাড়াও কাউন্সিল মুসলিম লীগের খাজা খয়ের উদ্দিন, কনভেনশন মুসলিম লীগের ফজলুল কাদের চৌধুরী (মুসলিম লীগ, কাইয়ুম) খান এ সবুর খান, জামায়াত ইসলামির গোলাম আজম, শাহ আজিজ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মওলানা আবদুল মান্নান, মওলানা আবদুর রহিম, আব্বাস আলী প্রমুখ ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সংগঠক।
শরণার্থী
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাকা- আর তাদের এদেশীয় কোলাবরেটর রাজাকার, আলবদর বাহিনীর অত্যাচারে প্রায় ১ কোটি মানুষ ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে আশ্রয় নেয়। ভারত সরকারের বৈদেশিক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ইধহমষধফবংয উড়পঁসবহঃং-এর প্রাপ্ত তথ্যমতে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ৬৯.৭১ লাখ শরণার্থী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন শহরে এসব শরণার্থীরা মানবেতর জীবনযাপন করে। ভারত সরকার এসব শরণার্থীদের আশ্রয় না দিলে ১ কোটি মানুষকেও হয়তো জীবন দিতে হত। অসুস্থ, বৃদ্ধ, নারী, শিশু দিনের পর দিন খেয়ে না খেয়ে, শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করে। ভারত সরকার চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র দিয়ে শরণার্থীদের সাহায্য করেছে।
মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও শিশু। যুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানিরা আমাদের দেশের নারীদের ধর্ষণ ও অকথ্য নির্যাতন করে হত্যা করে। নারী নির্যাতনের ধরন ছিল সভ্যতা বিবর্জিত পশুর আচরণের চেয়েও নিকৃষ্ট। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল বিকারগ্রস্ত, ভয়ংকর সাইকোপ্যাথ এবং স্যাডিস্ট। সেনাবাহিনী ক্যাম্পে নারীকে যৌনদাসী করে রাখা হত দিনের পর দিন। গষেণায় দেখা গেছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের ৫৬.৫০ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের ৪১.৪৪ শতাংশ এবং খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ২.০৬ শতাংশ নারী মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিত হয়েছে। নির্যাতিত হয়েও নারীর ভূমিকা ছিল বীরত্ব¡পূর্ণ। যেসব নারী নেতৃত্ব ইতিহাসে স্মরণীয় তাদের মধ্যে গীতা কর, কানন বিবি, সিতারা বেগম (বীর প্রতীক), তারামন বিবি (বীর প্রতীক) ছাড়াও জাহানারা ইমাম, কবি সুফিয়া কামাল, সাজেদা চৌধুরী, সুলতানা কামাল, আয়েশা খানম, বেগম মুশতারী শফী, কবি মেহেরুননেছা, মাহফুজা খানমের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সরবরাহ, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, অস্ত্র গোলাবারুদ বহন ও লুকিয়ে রাখা, বাঙ্কারে বাঙ্কারে খাদ্য পৌঁছানো, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা শুশ্রƒষা, অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশগ্রহণসহ নানা ভূমিকায় নারী মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হত।
স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এদেশের বুদ্ধিজীবী, লেখক, গায়ক, অভিনেতা, অভিনেত্রী, চিত্রশিল্পী, শিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, কলাকুশলি, সাহিত্যিক, কবি, সাংবাদিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার, গীতিকাররা অসামান্য ভূমিকা পালন করে। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ ডকুমেন্টরি বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’ পাঠ মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করত। ১৯৭১ সালের মে মাসের শুরু থেকেই ‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রেডিও স্টেশন হিসেবে অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করতে সক্ষম হয়। গীতিকার আবদুল লতিফ, গোবিন্দ হালদার, গৌরি প্রসন্ন মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশের গানগুলো বেতারকেন্দ্র থেকে বাজানো হত। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধকরি..., জয় বাংলা বাংলার জয়... তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে... শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠধ্বনি..., পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠেছে..., প্রভৃতি গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সাহস আর মনোবল বাড়িয়ে দিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন ক্যাম্পে ও শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘুরে ঘুরে ‘সাংস্কৃতিক স্কোয়াড’ নামে একটি সাংস্কৃতিক দল দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করত। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকার চলচ্চিত্রকার লেয়ার লেভিনের ক্যামেরায় ধারণকৃত ফুটেজ থেকে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ নির্মাণ করেছেন ‘মুক্তির কথা’ ও ‘মুক্তির গান’ নামে দুটি অসাধারণ তথ্যচিত্র।
গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ
পাকিস্তান সরকার বিশ্বের নেতৃবৃন্দকে বোঝাতে চাইতো পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সংকট চলছে। এটি তাদের অভ্যন্তরীণ সংকট। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর গণহত্যা কোনোভাবেই যাতে বিশ্বের কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশ না পায়, তার জন্য প্রায় ৩৫ জন বিদেশি সাংবাদিককে হোটেলে বন্দি করে রাখা হয়। অনেক সাংবাদিক আত্মগোপনে থেকে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশন করেন। সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান, মর্নিং নিউজ, দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক অবজারভার, দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে বলে প্রচার করত। ব্রিটিশ গণমাধ্যম যেমন বিবিসি, ডেইলি টেলিগ্রাফ, গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংবাদ পরিবেশন করে।
আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, বাল্টিমোর সান, নিউজউইক ম্যাগাজিন, টাইম ম্যাগাজিন, ভারতের অমৃতবাজার পত্রিকা, আনন্দবাজার, হিন্দুস্তান টাইমস, ফ্রন্টিয়ার, আকাশবাণী এবং সোভিয়েত রাশিয়ার দৈনিক প্রাভদাসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংবাদ পরিবেশন করে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে আগামী প্রজন্মের কাছে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরার মধ্যদিয়েই শুধু আমাদের অতীতকে সম্মান দেখাতে পারি।
