বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস
আমাদের গ্রহ, আমাদের স্বাস্থ্য
ডা. সমীর কুমার সাহা, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের সূচনা থেকেই সারা বিশ্বে স্বাস্থ্য সমস্যা এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে আসছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর এ দিবসের (৭ এপ্রিল) জন্য একটি ভিন্ন বিষয়বস্তু থাকে, যা স্কুল-কলেজ, চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট ও বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা, সেমিনার এবং কর্মশালায় তুলে ধরা হয়। এ দিবসটি সারা বিশ্বের দরিদ্র এবং কম ভাগ্যবানদের স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর জন্য সচেতনতা তৈরি করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যের জন্য দায়িত্ববান হতে এবং নিজেদের যত্ন নেওয়ার জন্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৯৫০ সাল থেকে প্রতিবছর ৭ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সারা বিশ্বে, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়ে আসছে। ১৯৪৬ সালের জুন ও জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাংগঠনিক আইন গৃহীত হয়। ১৯৪৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা ১৯৫০ সালে কার্যকর হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করে এমন গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়ার একটি বিশ্বব্যাপী সুযোগ প্রদান করে। আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তগুলো জলবায়ু এবং স্বাস্থ্য সংকটকে চালিত করছে। চরম আবহাওয়া, জমির ক্ষয় ও পানির অভাব মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে এবং তাদের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে ৯০ শতাংশ এরও বেশি মানুষ অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নেয়। বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিগর্মন তৈরি করে ক্যান্সার এবং বাড়াচ্ছে হৃদরোগ। মশারা আগের চেয়ে অনেক বেশি এবং দ্রুত রোগ ছড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর অনুমান, প্রতি বছর বিশ্বজড়ে ১৩ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় পরিবেশ দূষণগত কারণে। এদিকে কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের স্বাস্থ্য-সমাজের সব ক্ষেত্রের দুর্বলতাগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে।
টেকসই সুস্থ সমাজ গঠনে পরিবেশগত সীমালঙ্ঘন না করে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে। অর্থনীতির বর্তমান নকশায় আয়, সম্পদ এবং ক্ষমতার অসম বণ্টনের দিকে পরিচালিত করে, যেখানে অনেক মানুষ এখনও দারিদ্র্য ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে বসবাস করছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতির লক্ষ্য হলো সহনীয় পকেটমানি ব্যয়ে সমতার ভিত্তিতে মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করন। আমাদের প্রিয় পৃথিবী ও মানুষকে সুস্থ রাখার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অত্যন্ত জরুরি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলোর ওপর বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য একটি আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তাই এবারের স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে ‘আমাদের গ্রহ, আমাদের স্বাস্থ্য।’
বিপুল এ জনগোষ্ঠীর দেশে চাহিদার সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার জোগান বা পর্যাপ্ততা নিশ্চিত না করার ফলে রোগির চিকিৎসার খরচ মিটিয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছে ১৫ শতাংশ মানুষ। গরিব হচ্ছে, প্রতিবছর ৬৪ লাখ মানুষ। ‘বিল্ডিং অ্যাওয়ারনেস অব ইউনিভার্সেল হেলথ কভারেজ : অ্যাডভান্সিং দি এজেন্ডা ফরওয়ার্ড ২০১৯’ শীর্ষক এক রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে বাংলাদেশে জনপ্রতি পাবলিকের পকেট থেকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। জনপ্রতি ব্যয়ের দিক থেকে ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান, ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় ভারত, ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ দিয়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে নেপাল এবং ৩৫ দশমিক ৬ নিয়ে সবার নিচে রয়েছে থাইল্যান্ড।
উক্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ খাতে অপর্যাপ্ত ব্যয়, সরকারি ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণহীনতা, বাজেটে কম বরাদ্দ, বরাদ্দ অনুযায়ী সঠিকভাবে বণ্টন না করা, অতিরিক্ত পকেট মানি, সরকারি ও পকেট মানির বিস্তর ব্যবধান, নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত, স্বাস্থ্যবিমায় অনিহা, দাতাগোষ্ঠীর সহায়তা কমে যাওয়া ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর স্বল্প অংশগ্রহণের কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। গবেষণায় প্রমাণিত, ৬০ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পায় অসংগঠিত খাত থেকে, সরকারি খাত থেকে সেবা আসে ১৪ শতাংশ, আর বেসরকারি খাত থেকে ২৬ শতাংশ মানুষ সেবা পায়।
আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণ নিম্ন ও নিম্ন-মধ্য আয়ের। জটিল কঠিন রোগের জন্য আমাদের এ জনগোষ্ঠীর অনেকের পক্ষেই বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা কাজ চালানো দুরূহ ব্যাপার। অথচ আমাদের দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি (আয়ুর্বেদণ্ডইউনানীতে) একজন মানুষ অল্প খরচেই জটিল-কঠিন রোগের চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। প্রাকৃতিক পদ্ধতি হওয়ায় এ পদ্ধতিতে চিকিৎসার কোনো বিশেষ নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, যা অন্যসব আধুনিক পদ্ধতিতে লক্ষ্য করা যায়। আয়ুর্বেদ অ্যান্ড ন্যাচারোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আয়ুন্স) ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়নে প্রায় একযুগ ধরে কাজ করে আসছে।
আয়ুন্স মনে করে, এ খাতে উন্নয়ন সাধন করা গেলে, আমরা স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতি অর্জন করতে পারব। এ জন্য আয়ুন্স এ চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে গবেষণা চালানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে। ‘আমাদের দেশে গবেষণার সুযোগ খুবই কম। বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা খুব বেশি একটা হচ্ছে না। যেটা হওয়া একান্তভাবে প্রয়োজন বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও। তাই তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে গবেষণা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
অতি সম্প্রতি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, বিজ্ঞানী, গবেষক এবং বিজ্ঞানশিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ’, এনএসটি ফেলোশিপ’ এবং ‘বিশেষ গবেষণা অনুদান’ প্রদান অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আরও বেশি করে গবেষণা করতে হবে। এটাই পারে আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আজকে আমরা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পারতাম না, যদি গবেষণা না থাকত। এ জন্য আমি গবেষণাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। চিকিৎসা বিজ্ঞানে আমাদের গবেষণা কম। চিকিৎসা ক্ষেত্রে গবেষণা বাড়ানোর তাগিদ ও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
সম্প্রতি বাংলাদেশের একদল বিজ্ঞানী গবেষণা করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আরও একটি নতুন কারণ খুঁজে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, ক্ষুদ্রান্ত্রের ওপরের অংশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি জারক রস কমে গেলে এ রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ জারক রস বা এনজাইমের নাম ইন্টেস্টাইনাল অ্যালকেলাইন ফসফেটাস, সংক্ষেপে আইএপি। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের শরীরে আইএপি এর পরিমাণ কমে যায়, তাদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ১৩ দশমিক ৮ গুণ বেড়ে যায়। এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বারডেম হাসপাতালের ভিজিটিং অধ্যাপক ডা. মধু এস মালো, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাভার্ড মেডিকেল স্কুলের সাবেক সহকারী অধ্যাপক। অধ্যাপক মালো ও তার সহকর্মীরা ডায়াবেটিসের সঙ্গে আইএপির সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছেন ১৫ বছর ধরে। ঢাকার বারডেমে এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরে বলা হয়, ডায়াবেটিসের নতুন এ কারণ খুঁজে পাওয়ায় তা ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা করছেন। ‘ইন্টেস্টাইনাল অ্যালকেলাইন ফসফেটাস ডেফিসিয়েন্সি ইনক্রিজেস দ্য রিস্ক অব ডায়াবেটিস’ শীর্ষক তাদের এ গবেষণা প্রবন্ধটি সম্প্রতি ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ‘দ্য বিএমজে ওপেন ডায়াবেটিস রিসার্চ অ্যান্ড কেয়ার’ এ প্রকাশিত হয়েছে।
অধ্যাপক মালোর ভাষ্যমতে, শরীরে আইএপির পরিমাণ জানতে পারলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আছে কি-না, তা জানা সহজ হয়ে যাবে। আর মানুষের মল পরীক্ষার মাধ্যমেই সেটা জানা সম্ভব। স্টুল পরীক্ষার জন্য তরা একটি কিটও বানিয়েছেন। এছাড়া যে কোনো ল্যাবেও এ পরীক্ষা করানো যায়। আইএপির পরিমাণ জানা থাকলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। গত ৫ বছরে ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সি ৫৭৪ জন সুস্থ্য মানুষের ওপর গবেষণা করে ডায়াবেটিসের এ নতুন কারণ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন তারা। মানবদেহের অন্ত্রে থাকা মৃত ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীরের অংশ টক্সিন হিসেবে কাজ করে। এ টক্সিন মূলত মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। কিন্তু উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, ফ্রুকটোজ বা অ্যালকোহল টক্সিনকে রক্তে ঢুকতে সহায়তা করে। এর ফলে নিম্ন গ্রেডের সিস্টেমিক প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে ডায়াবেটিস হতে পারে। অন্ত্রে থাকা আইএপি এনজাইম এই টক্সিনকে ধ্বংস করে। যাদের শরীরে এই এনজাইম বেশি থাকে তাদের চেয়ে এনজাইম কম থাকা মানুষের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা ১৩ দশমিক ৮ গুণ বেশি।
চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই যদি সচেতন ও আন্তরিকতা নিয়ে
এগিয়ে আসেন এবং ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেন, তাহলে নব নব আবিষ্কার জটিল কঠিন রোগ মোকাবিলাসহ আমাদের দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনি করি।
