প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ৩০ এপ্রিল, ২০২২
নগর জীবনের নাগরিক সমস্যাগুলোর অন্যতম যানজট সম্পর্কে অবগত নয় এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। সমাজ অভিযোজনের কালচক্রে মানুষের নগরমুখী হয়ে পড়ার ফলে নগরে জনসংখ্যার আধিক্য বেড়ে যায়। বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অত্যধিক। জীবিকার তাগিদে গ্রাম থেকে ছুটে আসা মানুষগুলো স্থানীয়দের সঙ্গে নগরের রাস্তাগুলোতে পিপীলিকার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থায় যখন সম্ভাব্যের তুলনায় অধিক যানে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তখনই দেখা দেয় এই যানজট! যানজটের প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে-অবৈধ রাস্তা দখল এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা। একটি মেগাসিটিতে মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ রাস্তা থাকতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশে সচরাচর এই পরিমাপের ৮-১০ ভাগ কার্যত হিসেবে দেখা যায়। একটি পূর্ণ পরিসর প্রাপ্ত সড়কও পাচ্ছে না তার যোগ্য ব্যবহার ব্যবস্থা।
সড়কের অর্ধেকটা জায়গা দখল করে বিভিন্ন দোকানিরা। তাদের বেচাকেনা অব্যাহত থাকাকালে রাস্তায় আটকে পড়ে শত শত গাড়ি। তবে সেদিকে যেন কারও নজর নেই! আমাদের জনসংখ্যার অনুপাতে রাস্তা না বাড়লেও নির্বোধ জনগণ অবৈধভাবে সীমিত আকারের রাস্তাকে গাড়ির শো-গ্রাউন্ড বানাতে প্রস্তুত। যান চলাচলের জায়গায় ময়লার গাড়ি রাখার সুযোগ পেলেই সেটাও তারা হাতছাড়া করতে নারাজ। তা ছাড়া অবৈধভাবে লাইসেন্সবিহীন যত্রতত্র যানবাহন পার্কিং করেও হীন কর্মে চর্চাশীল থাকেন তারা। অপরদিকে চালকরা নিজেদের ইচ্ছা মতো গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। মানতে চায় না কোনো ট্রাফিক রুল। নিজেদের বিজ্ঞ মনে করে জ্ঞানহীন চালকরা ওভারটেকিংয়ের মাধ্যমে অন্য গাড়িগুলো ছাড়িয়ে যেতে চেয়ে একসময় নিজেরাই যাত্রীসহ আটকে পড়ে যানজটে। নগরীর রাস্তাগুলোর পথচারীরা পর্যাপ্ত ওভারব্রিজের অভাবে যখন মূল সড়কে চলাচল করে তখন তাদেরও ট্রাফিক জ্যামের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
বিত্তশালীরা একক পরিবহনের জন্য যে ব্যক্তিগত গাড়িগুলো ব্যবহার করে থাকেন সেগুলো শহরের মোট সড়কের শতকরা ৫৪.২ ভাগ অংশজুড়ে থাকে। তবে হিসাব করে দেখা গেছে যে, এগুলো ১২ ভাগ যাত্রীও বহন করে না। সূক্ষ্ম বিচারে দেখা যায়, বিত্তশালীদের ব্যক্তিগত একটি গাড়ি ১০ জন সাধারণ যাত্রীর জায়গা দখল করে, যা যানজটের অপ্রতিরোধ্য কারণ।
মাঝে মাঝে যানজট এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, অসংখ্য যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে আটকে থাকে। যার ভোগান্তি এককথায় অবর্ণনীয়। যানজট ১.৫ কোটি নগরবাসীর জীবন থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ঘণ্টা কেড়ে নিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন গড়ে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। যার আর্থিক মূল্য বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। আর দিন আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সকল শ্রেণিপেশার মানুষ প্রত্যেক অবস্থান থেকে নিজেদের মূল্যবান সময়কে হারিয়ে ফেলে, যা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিদিন শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স যাত্রাকালে এই যানজটের কবলে পড়ছে। উপযুক্ত সময়ে হাসপাতালে না পৌঁছতে পেরে রোগীদের কপালে জোটে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু। যানজটের কারণে নগরের রাস্তাগুলোতে দিন দিন ছিনতাইকারীদের ব্যবসা ভালোই জমে উঠেছে। অন্যদিকে যানজটের জন্য প্রতিদিন ৪০ ভাগ বাড়তি জ্বালানি পোড়ানো হয়। যার আর্থিক মূল্য ৪.২ কোটি টাকা। দিনশেষে এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
মোদ্দা কথা হলো, যানজট একটি দেশের ভোগান্তি বয়ে আনতে একাই সক্ষম। তাই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। আমাদের যতটুকু সড়কপথ আছে, তাতে বর্তমানে যথাযথ পদক্ষেপ নিলে যানজট ৮০ ভাগ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। আমাদের সরকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের পাশাপাশি সাবওয়ের মতো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে সরকারি তৎপরতার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা আবশ্যক। তাছাড়া ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে পারলে এবং দেশকে যানজট থেকে মুক্ত করতে সরকারি সব পদক্ষেপ যথাযথভাবে পালন করতে পারলেই আমাদের দেশ অনেকাংশে যানজটমুক্ত হয়ে ওঠবে।
শিক্ষার্থী
চরফ্যাসন, ভোলা