প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ মে, ২০২২
বর্তমান সভ্যতায় প্লাস্টিক নামক বস্তুটির সঙ্গে মানুষের পরিচয় আছে, সখ্য আছে। মোট কথা মানুষের কাছে এটি অতিমাত্রায় গ্রহণযোগ্য। ঠিক যতটা আমরা পলিথিন ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি! প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা যা বিভিন্নভাবে বিশেষত খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে এবং শরীরের ক্ষতি সাধন করছে। আমরা বাজার থেকে যে ফেসওয়াশ, টুথপেস্ট, প্লাস্টিকের ব্যাগ, স্ট্র, ছোট বোতল, ফেসিয়াল স্ক্রাব বা এ ধরনের ছোট ছোট পণ্য ব্যবহার করছি, এসব পণ্যই পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে যে টুথপেস্ট ব্যবহার করছি আবার রাতে ঘুমানোর আগেও তা ব্যবহার করছি সেসব শেষ হলে তো তা ফেলে দিই যেখানে-সেখানে। আর প্লাস্টিক থেকে সৃষ্ট মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় ১৫ প্রজাতির দেশি মাছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার সন্ধান পাওয়া গেছে। ‘অ্যাবান্ড্যান্স, ক্যারেক্টিরিস্টিকস অ্যান্ড ভেরিয়েশন অব মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন ডিফারেন্ট ফ্রেশ ওয়াটার ফিশ স্পিস ফ্রম বাংলাদেশ’ শিরোনামে পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘সায়েন্স অব দ্য টোটাল ইনভায়রমেন্ট’ প্রকাশিত গবেষণায় এ তথ্য জানা যায়। যে মাছগুলোতে এ কণা পাওয়া গেছে সেগুলো হলো- তেলাপিয়া, কালিবাউশ, টেংরা, কই, বাটা, রুই, বেলে, কমন কার্প, পাবদা, পুুঁটি, রায়না, শিলং, বাইন, টাটকিনি ও বাছা মাছে। এর আগে দেশে সুস্বাদু পানির কোনো মাছে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এছাড়া সামুদ্রিক মাছের পরিপাকতন্ত্রে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। আবার প্লাস্টিক বর্জ্যরে ওপর ২৪টি গবেষণা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে গত বছর মার্চে সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রমেন্ট জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা মাছসহ নানা প্রাণীর দেহে প্রবেশ করছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে তা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশে উৎপাদিত লবণেও মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকারক মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ‘প্রোলিফারেশন অব মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন কমার্শিয়াল সি সল্টস ফ্রম দি ওয়ার্ল্ডস লংগেস সি বিচ অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, এ লবণের প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬৭৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। সেখানে বলা হয়, দেশের মানুষ যে হারে লবণ গ্রহণ করে, তাতে প্রতি বছর একজন মানুষ গড়ে প্রায় ১৩ হাজার ৮৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে। ২০১৫ সালে দ্বিতীয় জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশ বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিককে। এর চেয়েও মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে। প্রথমবারের মতো মানুষের রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। গবেষকরা জানান, পরীক্ষায় প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের রক্তে এই প্লাস্টিক ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া গেছে। গত ২৪ মার্চ গার্ডিয়ান জানায়, বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন যে, কণাগুলো মানুষের শরীরে চলাচল করতে পারে এবং বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জায়গা করে নিতে পারে। তবে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব কেমন হবে তা এখনও জানা যায়নি। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবকোষের ক্ষতি করে এমন প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। মানুষের শরীর ক্রমেই বিভিন্ন পদ্ধতিতে দূষিত কণা প্রবেশের ফলে কঠিন রোগের ঝুঁকিতে থাকছে। আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে এর জন্য দায়ী। ফলে পরিবেশকে এর হাত থেকে বাঁচাতে সবারই ভূমিকা থাকা উচিত। যার মূলেই রয়েছে সচেতনতা।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হচ্ছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা। ৫ মিলিমিটারের চেয়ে কম আকারের প্লাস্টিকের কোনো টুকরাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া রয়েছে ন্যানো প্লাস্টিক। তা আরও ক্ষুদ্র। আমরা চোখে দেখতে পারি না। অথচ শরীর তা গ্রহণ করছে! মাইক্রোপ্লাস্টিক কথা প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র জীববিজ্ঞানী রিচার্ড টমসন প্রথম প্রচলন করেন। আমরা সচরাচর এসব কণার বিষয়ে সচেতন নই আর দৃষ্টিগোচরও হয় না। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যের সঙ্গেই দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে এসব কণা। আমাদের নিত্যব্যবহার্য পণ্যগুলো থেকেই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ ঘটছে। এটা সবার জানার বা বোঝার কথাও নয়। কারণ এই ধারণাটি আমাদের মধ্যে সেভাবে বিস্তার লাভ করেনি। বিজ্ঞানীদের কথায়, বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য পানিতে ফেলে দিলে সেসব ফটোকেমিক্যালি ও বায়োলজিক্যালি ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। তারপর সেসব চলে যায় মাছের পেটে এবং সেখান থেকে মানবদেহ পর্যন্ত। এই প্রক্রিয়াটি এখনও প্রান্তিক মানুষের সচেতনতার বাইরেই রয়ে গেছে। পরিবেশ এবং মানবস্বাস্থ্য দুইয়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর এই মাইক্রোপ্লাস্টিক। পানীয় পান করেই তা রাস্তায় ছুড়ে ফেলছি। তারপর তা চলে যাচ্ছে ড্রেনে। সেখান থেকে নদীতে। আবার নদীর তীরে বসে বা লঞ্চে বা নৌকায় বসে খাওয়ার পর সেসব নদীতেই ফেলে দিচ্ছি। নদীতে এসব বোতল ভাসতে দেখা যায়। সেখান থেকে অনেকে আবার তা সংগ্রহ করে বিক্রি করছে এবং সেখান থেকে রিসাইকেল হচ্ছে। কিন্তু কতটা রিসাইকেল হচ্ছে সেটাই প্রশ্ন। এসব ব্যবহারের পরপরই আমরা ছুড়ে ফেলছি রাস্তায়, ড্রেনে, নদীতে, পার্কে, সাগরে। এক কথায় যেকোনো স্থানে। ছুড়ে ফেলাটাই তো আমাদের অভ্যাস! এগুলো একত্রিত করে পুড়িয়ে ফেলার কার্যক্রমও চোখে পড়ে না। এত কষ্ট কেউ করছেও না। একবার ভাবুন তো, প্রতিদিন কত মানুষ প্রতিদিন ছোট ছোট নিত্যব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছে আবার তা ছুড়ে ফেলছে। এসব জঞ্জাল পরিষ্কার করার কেউ নেই।
সাগর, নদী, পুকুর কোথাও প্লাস্টিকের দূষণ থেকে বাদ যাচ্ছে না। এমনকি হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পৌঁছে গেছে। এক সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছিল, পৃথিবীর বিভিন্ন মহাসাগরের তলদেশে ৯৩০০০-২৩৬০০০ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক জমে রয়েছে। আমরা যখন বুঝতে শিখেছি যে প্লাস্টিক আমাদের পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানবদহের জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে, তখনও আসলে এর ব্যবহার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কারণ আপাতত আমরা এতে অভ্যস্থ হয়ে গেছি এবং দৃশ্যত কেউ বুঝতেই পারছে না এর ক্ষতির দিকটি। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয় বা হচ্ছে; কিন্তু ব্যাপকভাবে বিষয়টি আলোচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এছাড়া আমাদের কী করার আছে? আমরা চাইলেই নিত্যব্যবহার্য জিনিস ছেড়ে দিতে পারব না, তা সম্ভবও নয়। আবার বিকল্পও আমাদের হাতে নেই। এর ব্যবহার বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আজ চা খেতেও ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার করি। আর বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠানে তো ওয়ান টাইম প্লেট-গ্লাস ব্যবহার করি। আবার ব্যবহার করেই তা যেখানে সেখানে ছুড়ে ফেলি। সাগরের মৃত প্রাণীদের পেটে পাওয়া যাচ্ছে প্রচুর প্লাস্টিক, যা আমরা বিভিন্ন সময় সাগরের বুকে নিক্ষেপ করছি। কেবল সচেতনতা এবং রিসাইকেলের অভাবেই এসব সামগ্রী পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশছে আমাদের মাটিতে। মোট কথা, এই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পরছে। তবু আমাদের নিত্যব্যবহার্য পণ্যের একটি বড় অংশই রিসাইকেলের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। আমরা যখন নদীতে প্লাস্টিক ছুড়ে ফেলছি, তখন তা রিসাইকেল কে করবে? মাইক্রোপ্লাস্টিকের যে পরিবেশগত এবং মানব শরীরের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা থেকে একমাত্র সচেতনতাই ফেরাতে পারে এবং যে কোনোভাবেই হোক প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের আওতায় এনে মাটি, পানি বা বাতাসের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মিশে যাওয়া আটকাতে হবে।