প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ মে, ২০২২
দেশে প্রচলিত পাঠদান পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশে কতটুকু ভূমিকা রাখছে এই প্রশ্ন অনেকের। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, সিলেবাসের নানা পরিবর্তন সত্ত্বেও মুখস্থবিদ্যার ওপর এখনও জোর দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকের কাছে কোনো রকমে সিলেবাস শেষ করা বড় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষক ও অভিভাবকরাও যেনতেনভাবে শিক্ষার্থীরা অধিক নম্বর পেলেই খুশি থাকেন। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। দেখা গেছে, দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই চলমান পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। এমনকি খোদ শিক্ষকদের ২৯ শতাংশও বর্তমান পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ করার সুযোগ কেমন? শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ায় একজন শিক্ষার্থীর নিজের মতো করে চিন্তা বা প্রশ্ন করার সুযোগই বা কতটুকু? এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ছোট পরিসরে ওই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে নায়েম। গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তবে এই প্রতিবেদনের ফলাফলে পাঠদান বিষয়ে একটি সাধারণ পরিস্থিতিও উঠে এসেছে, যা আমাদের জন্য সুখকর নয়।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষক কিংবা সহায়ক বইয়ের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের চিন্তার ভিত্তিতে শিখতে পারলে সেটি বেশি ইতিবাচক বা ফলপ্রসূ হয়। যদিও খুব কমসংখ্যক শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের নিজেদের মতো চিন্তা করতে উৎসাহিত করেন। বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও শিক্ষক নির্ধারিত নিয়ম বা সহায়ক বই অনুসারেই শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর লিখতে হয়। অর্থাৎ সাধারণত পরীক্ষায় কীভাবে ভালো নম্বর পাওয়া যায়, সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরিবার, শিক্ষক ও অন্যদের এদিকেই নজর থাকে। অন্য আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় চিন্তার দক্ষতা বা যোগ্যতাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। এজন্য শিক্ষার্থীরাও এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার উৎসাহ পায় না। শ্রেণিকক্ষে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ প্রক্রিয়া প্রয়োগের বিভিন্ন বাধার কথা তুলে ধরা হয়েছে নায়েমের ওই গবেষণা প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের বেশিরভাগই মনে করেন, মানসিকতা ও যোগ্যতার অভাব, শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ, সময়স্বল্পতা, মুখস্থনির্ভর পাঠ উপকরণ, অতিরিক্তসংখ্যক পরীক্ষা, বড় আকারের শ্রেণিকক্ষ ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবেই শ্রেণিকক্ষে সৃষ্টিশীলতা কিংবা অংশগ্রহণমূলক পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে শিক্ষকদের ওপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভালো নম্বর নিশ্চিত করার একটি বড় চাপ থাকে। সুতরাং তাদের সবারই লক্ষ্য থাকে পরীক্ষা ও নম্বর। অর্থাৎ এখানে শিক্ষার্থীদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং অ্যাবিলিটির জন্য আলাদা কোনো মূল্যায়ন পদ্ধতি নেই। বলাবাহুল্য, এভাবে যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা অর্জন আদৌ সম্ভব হয়ে ওঠে না।
এটা স্পষ্ট যে, সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়া সত্ত্বেও দেশে শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকটাই মুখস্থনির্ভর। অর্থাৎ প্রয়োগের ক্ষেত্রে চিত্র অনেকটা আগের মতোই। এ প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসতে সবার আগে শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় নিয়ে আসতে হবে। দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও শিক্ষকতাকে উপভোগ করেন, এমন শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। শিক্ষাক্রম বিষয়েই শিক্ষকদের অবশ্যই স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। সৃজনশীল জাতি গঠনে অবশ্যই সৃজনশীল পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।