প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৯ জুন, ২০২২
‘আলো ছাড়া কেউ চলতে পারে না, বিশ্ববিদ্যালয় হলো আলো সৃষ্টি ও আলোকিত করার জায়গা’। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থীদের নবীনবরণে উক্তিটি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন। উচ্চশিক্ষায় এদেশের মানুষকে আলোকিত করার জন্য ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫১ বছর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১০১ বছরে বর্তমানে দেশে ৫১টি পাবলিক এবং ১০৮টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক সময়ের অবহেলিত উত্তরাঞ্চলের মানুষকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে ১৯৫৩ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ৫ জুন ৩০ একর জায়গার ওপর পাবনা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বে ঢাকাণ্ডপাবনা মহাসড়কের পাশে রাজাপুরে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৪ বছরের নবীন এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গত ৫ জুন ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করেছে। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩টি অনুষদের অধীনে সিএসই, ইইই, গণিত এবং ব্যবসায় প্রশাসন- এই চারটি বিভাগ, ১৮০ জন শিক্ষার্থী, ১২ জন শিক্ষক এবং ৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। বর্তমানে ১৭৭ জন শিক্ষক, ১০৫ জন কর্মকর্তা এবং ১৯৪ জন কর্মচারী কর্মরত আছেন। প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। প্রতিষ্ঠানটি নবীন হলেও এখানকার একদল তরুণ শিক্ষক মেধা, প্রজ্ঞা, শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতি আর নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে ৫টি অনুষদের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১টি বিভাগ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিভাগগুলো : বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, ফার্মেসি, রসায়ন, ও পরিসংখ্যান বিভাগ। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের অধীনে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, স্থাপত্য এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে ব্যবসায় প্রশাসন এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজম্যান্ট বিভাগ। মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে অর্থনীতি, বাংলা, ইংরেজি, সমাজকর্ম, লোকপ্রশাসন এবং ইতিহাস ও বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগ। আর জীব ও ভূবিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা অ্যালপার ডগার (এডি) সায়েন্টিফিক ইনডেক্স র্যাঙ্কিংয়ে ২০২২ এ বিশ্বসেরা গবেষকের তালিকায় স্থান পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬ জন গবেষক। এদের মধ্যে ২৫ জন শিক্ষক এবং একজন শিক্ষার্থী। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ জন অধ্যাপক আছেন। দেশে ও দেশের বাইরে থেকে ৪৪ জন শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রশাসনিকভাবে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।
বেশকিছু ক্ষেত্রে সুযোগের স্বল্পতা থাকলেও স্বল্প সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে দিনে দিনে এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন শেষে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে চাকরিতেও সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, দুটি হলো, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, দৃষ্টিনন্দন একটি লেক, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, ক্যান্টিন, কেন্দ্রীয় মসজিদ, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য যানবাহন ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক একটি ভিডিও কনফারেন্স রুম, স্বাধীনতা চত্বর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিকে ধারণ ও ধরে রাখার জন্য ‘জনক জ্যোর্তিময়’ নামে একটি ম্যুরালসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ক্যাম্পাসে এখন অবিরাম ৪৮০ কোটি টাকার দ্বিতীয় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পের আওতায় ১২তলা দুটি অ্যাকাডেমিক ভবন, ১০ তলা বিশিষ্ট একটি ছাত্র ও একটি ছাত্রী মোট ২টি হল, ১০ তলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন, ৪ তলা কনভেনশন সেন্টার, ৪ তলা টিএসসি ও গেস্ট হাউজ ভবন, একটি অ্যাম্পিথিয়েটার, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি মন্দির, প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রনে বিশ্ববিদ্যালয় গেটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এর মধ্যেই কিছু স্থাপনার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং কিছু কাজ সমাপ্ত হওয়ার পথে।
২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি ৪ লাখ টাকার বাজেট বরাদ্দ করেছে। এর মধ্যে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বরাদ্দ পেয়েছে ৪৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়টি এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থই পাবনার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে পাবনার অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এর আশপাশে দৃষ্টান্তমূলক অগ্রগতি ও উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এ এলাকায় শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং যোগাযোগসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি হয়েছে।
এখানকার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কাজও করে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক, জেলাভিত্তিক, বিভাগভিত্তিকসহ বিভিন্ন সংগঠন তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। সংগঠনগুলো হলো : সাংস্কৃতিক সংগঠন অনিরুদ্ধ নাট্যদল, আবৃত্তি সংগঠন কণ্ঠস্বর, আবৃত্তি দল, ব্যান্ড বা গানের দল ডিস্টিউন, কাব্য, পাস্ট ডিবেটিং সোসাইটি, প্রথম আলো বন্ধুসভা, পাস্ট ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, পাস্ট ফিল্ম সোসাইটি, বিজ্ঞান সংগঠন সাইন্টেরিয়া, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক সংগঠন ইয়ূথ অ্যালায়েন্স সলভার গ্রিন, ফার্মা ক্যারিয়ার ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জোনাকি, নতুন সূর্যোদয়, আগামীর সূর্য, হেল্প, বন্ধু, রোভার স্কাউট গ্রুপ, ইয়েলো ল্যাম্পসহ বিভিন্ন সংগঠন।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন। এ বছরের ১৩ এপ্রিল তিনি উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তার ভাবনা ও কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে এই লেখককে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টি নবীন হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম ঠিকঠাক মতোই চলছে। আমি এখানে যোগদানের পর থেকেই প্রতিটি কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী করার চেষ্টা করছি। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আরও আধুনিক এবং উন্নত করতে চাই। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই। তিনি আরও যোগ করে বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে গুণগতমান বজায় রেখে কাজ করা হবে। গুণগতমানের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে উপকরণও বাড়াতে হবে।
স্থান সংকুলান না হলে ভালো কাজ করা যায় না। শিক্ষার মান বাড়াতে হলে আমাদের অবশ্যই স্থান বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, আধুনিক ও গুণগত মানসম্পন্ন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কমপক্ষে ১০০ থেকে ১৫০ একর জায়গা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০০ একরে উন্নীত করার জন্য আমরা কাজ করছি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে এ ব্যাপারে সভা করেছি এবং মন্ত্রণালয়েও কথা বলেছি। সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমার প্রতিনিয়ত কথাবার্তা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটিও করা হয়েছে, তারা কাজ করছে এবং আমিও এর সঙ্গে যুক্ত আছি।
শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন নতুন রোল মডেল আনতে চাই। যারা দেশ এবং জাতির জন্য ভালো কাজ করেছেন। তাদের শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই। যাতে তারা আরও বেশি উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণা পায়। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডেও উৎসাহিত করা হবে। আমাদের সুযোগ-সুবিধা সীমিত, সেটাকে আরও বাড়াতে হবে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আরও দক্ষ জনশক্তিতে গড়ে তোলার জন্য শিগগির প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে।
তিনি বেশকিছু অসুবিধার কথাও বলেন, আমাদের শিক্ষক সংকট আছে, ক্লাসরুমের স্বল্পতা, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট, ল্যাবে সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা, টিএসসি নেই, অবকাঠামো সীমিত, ভাতরুমের স্বল্পতা, শুধু একটি খেলার মাঠ বাদে উন্মুক্ত জায়গা নেই, মেডিকেল সেন্টারে সুযোগ-সুবিধা খুবই অপ্রতুল, আইটি সুযোগ কম, আমাদের ডিনদের কোনো ডিন অফিস নেই, লাইব্রেরিতে বইয়ের স্বল্পতা, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসেবে বিদ্যুৎ অপরিহার্য। কিন্তু যখন তখন বিদ্যুৎ চলে যায় এবং প্রায়ই থাকে না বলে তিনি এসব সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এতো সমস্যার মাঝেও তিনি আশার কথা বলেন, আমাদের বড় একটি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এর ফলে অবকাঠামো বাড়বে। কাজটি শেষ হলে সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে এবং গুণগত শিক্ষাকে আরও ত্বরান্বিত করা যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ১৪ বছরে পদার্পণ করেছে; কিন্তু এখনও সমাবর্তন করা যায়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে, আমি এ বছরের এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর ২২ মে কেন্দ্রীয়ভাবে আমরা নবীন শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের উপস্থিতিতে নবীনবরণের আয়োজন করি। গত ৫ জুন বিশ্ববিদ্যালয় দিবস সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর উপস্থিতিতে আমরা সফলভাবে উদযাপন করেছি। ধাপে ধাপে আমরা কাজ করছি এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত সমাবর্তন দ্রুততম সময়ের মধ্যেই আয়োজন করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আন্তরিকতা এবং শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি দিন দিন অগ্রগতি ও উন্নতি সাধন করছে।