শিশুকে পর্নো আসক্তি থেকে দূরে রাখুন
আবির হাসান সুজন
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
শিশুরা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনার বলিষ্ঠ অঙ্গীকার, যাদের কর্মসাধনা ও সিদ্ধির ওপর নির্ভর করে দেশ ও জাতির গৌরব-ইতিহাস, যারা আগামী দিনের স্বপ্ন ও সার্থকতা। শিশুরাই আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন। অনাগত দিনের নতুন ইতিহাস। এদের মধ্যেই সুপ্ত আছে ভাবীকালের কত কবি শিল্পী, সাহিত্যিক, কত সত্যসন্ধ বিজ্ঞানী, কত দুঃসাহসী অভিযাত্রী, কত আলোকতীর্থের অভিসারী যুগাবতার ধর্মগুরু, ইতিহাসের কত খ্যাত-কীর্তি পুরুষ। এই দিকে ইন্টারনেটের আশীর্বাদে আমাদের বেঁচে থাকাকে অনেক রঙচঙে ও সহজ-সামাজিক করে তুলছে বটে; কিন্তু এসবের হাত ধরেই আবার শিশু বা কিশোর বয়স পৌঁছে যাচ্ছে পর্নো সাইটের দিকেও। নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ক্রমেই শিকার হচ্ছে তার। কেউ বা সরাসরি অংশ নিচ্ছে চাইল্ড পর্নোগ্রাফিতে।
এমনিতেই বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছনোর পর শারীরিক নানা পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিক পরিবর্তনের শিকার হয় কিশোর-কিশোরীরা। আর তখনই পর্নোগ্রাফির নেশার শিকার হতেই পারে তারা, কখনও নিছকই কৌতূহলের বশে আবার কখনও অজান্তেই।
কয়েকবার পর্নো দেখার পর মস্তিষ্কের তৃপ্তি কেন্দ্র, বিষয়টির সঙ্গে একটি শর্তাধীন অবস্থা তৈরি করে, যা ক্রমে অভ্যাসে পরিণত হয়, অভ্যাস থেকে তৈরি হয় আসক্তি। ব্যক্তিত্বের ধরন, সঠিক যৌন শিক্ষার অভাব, পরিবেশের প্রভাব, মানসিক চাপ সামলাতে না পারা, শিশু বয়সে নির্যাতনের শিকার হওয়া, অন্যকে দেখে শেখা, সমবয়সিদের চাপ, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, সুস্থ বিনোদনের অভাব, পরিবারে নৈতিকতার চর্চা কম থাকা ইত্যাদি কারণেও পর্নোতে আসক্তি হচ্ছে শিশুরা।
ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে প্রতি তিনজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজন শিশু। আর প্রতিদিন ১ লাখ ৭৫ হাজার অর্থাৎ প্রতি আধা সেকেন্ডে একজন শিশু নতুন করে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের ২৫ শতাংশের বয়সই ১০ বছরের কম এবং ফেইসবুকসহ সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়ার ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারীর বয়সই ১৮ থেকে ২৯-এর মধ্যে। জার্নাল অব ইয়ুথ স্টাডিজ জানায়, আমেরিকান শিশু-কিশোরদের ৯২ ভাগই প্রতিদিন অনলাইনে যায়। প্রতি পাঁচজনে একজন কিশোর গভীর রাতে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে শুধু এটা দেখার জন্য যে, তার মোবাইলে নতুন কোনো মেসেজ এসেছে কি-না।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে শতকরা ৭৮ ভাগ শিক্ষার্থী গড়ে আট ঘণ্টা মোবাইলের পেছনে ব্যায় করে। আর শুধু প্রেম করার উদ্দেশ্যে মোবাইল ব্যবহার করে শতকরা ৪৪ শিক্ষার্থী। শুধু উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীরাই নয়, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ রয়েছেন যারা এ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। এই পর্নো আসক্তি কখনও আসক্তিজনিত সমস্যা, কখনও বাধ্যতাধর্মী আচরণের সমস্যা, আবার কখনও তা যৌন বিকৃতির অংশ। পর্নো আসক্তি নিজেই একটি সমস্যা, আবার কখনও তা বিভিন্ন মানসিক রোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
পর্নো আসক্তি শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণ করে তোলে। শুধু তাই নয়, সমাজে ধর্ষণ, যৌনহয়রানিসহ নানা ধরনের যৌনঅপরাধ বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফি আসক্তি বড় ভূমিকা রাখছে। ধর্ষণ ও যৌনহয়রানির মামলাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অপরাধীর মধ্যে কোনো না কোনোভাবে পশুত্ব জেগে ওঠে। আর এর জন্য অনেকাংশে দায়ী প্রযুক্তির সহজলভ্যতা। শুধু তাই নয়, শিশুরা তাদের নীতিনৈতিকতা জলাঞ্জলি দিচ্ছে। অল্প বয়সে মাদকে আক্রান্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে খুব ছোট আকারের একটি জরিপে দেখা গেছে, স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখে থাকে। প্রথমে তৈরি হয় কৌতূহল, এরপর আগ্রহ, আগ্রহ থেকে অভ্যাস আর অভ্যাস থেকে আসক্তি।
তাই জাতির কাণ্ডারি, আগামীর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় তাদের পর্নো আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হবে। এই ক্ষেত্রে মা-বাবাকে দর্পণের ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে সুস্থ সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পেতে হবে, তাদেরকেও সুস্থ সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষার্থী
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
