প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০২ অক্টোবর, ২০২২
২০০৭ সালের ২ অক্টোবর জাতিসংঘের সাদারণ সভায় আন্তর্জাতিক অহিংস দিবসের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এর পর থেকে ২ অক্টোবর সারা বিশ্ব অহিংস দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসেবে কেন এই দিনটিকে বেছে নেয়া হলো? এর উত্তর হচ্ছে পৃথিবীতে একজন অহিংসবাদী আধ্যাত্মিক মহান ব্যক্তি জন্মেছিলেন এই দিনে। তিনি হচ্ছেন- ভারতীয় উপমহাদেশের মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী। ১৮৬৯ সালে ২ অক্টোবর ইনি ভারতের গুজরাট প্রদেশের পারবন্দর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। যিনি পরবর্তী সময়ে মহাত্মা গান্ধী হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। মহাত্মা গান্ধী স্বাধীন ভারতের জাতির পিতা। তিনি ভারতীয় রাজনীতির প্রাণ পুরুষ হিসেবে বিবেচিত। রাজনীতিতে এ ধরনের আধ্যাত্মিক নেতা বিশ্বে বিরল। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। তার আন্দোলন ছিল অহিংস ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন। ১৯১৫ সালে ৯ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন। এ দিনটিকে প্রবাসী ভারতীয় দিন হিসেবে পালন করা হয়। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাহী হন। ইংরেজদের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে তিনিই ভিন্নধর্মী আন্দোলন গড়ে তোলেন- যা অপেক্ষাকৃত বেশি শক্তি সঞ্চয়ে কার্যকরী হয়। তিনি হয়ে উঠেন প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক রাজনৈতিক নেতা। কীভাবে আত্মোন্নতি করতে হয়, আত্মবিশ্বাস জাগাতে হয়, বাধা বিপর্যয়ের সামনা-সামনি হওয়ার সামর্থ্য অর্জন করতে হয়, কীভাবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মনুষ্য পদবাচ্য হতে হয় মহাত্মা গান্ধী রাজনীতিতে সে শিক্ষারই অবতারণা করেন। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারই উত্তরাধিকার রাজনীতিতে সেই দর্শন সামনে নিয়ে এসেছেন। যদিও তাকে মহল বিশেষ সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। কার্যত : নরেন্দ্র মোদি বৈদান্তিক দর্শনভিত্তিক ভারত গড়ে তুলতে মনোযোগী হয়েছেন। বৈদান্তিক দর্শন-ই হচ্ছে অহিংসবাদী দর্শন। নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে ভারত গান্ধী যুগে প্রত্যাবর্তন করেছে। যা হোক, আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসেবে মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনটি আন্তর্জাতিকভাবেই গৌরব বহন করে চলেছে। অহিংস মতবাদে বিশ্বাসী একজন সাধারণ মানুষ অসাধারণ এক আন্দোলনের সূচনা করে বিশ্ববাসীর হৃদয় মন্দিরে স্থান করে নিয়েছিলেন। প্রথাগত রাজনীতির বিপরীতে এমন এক দর্শন উপস্থাপন করেছেন যার জন্য মানবসভ্যতা ভিন্ন উচ্চতায় জায়গা পেয়েছে। মানবীয় ক্রমবিকাশ জৈবস্তরীয় নয়; নিশ্চিতরূপেই তা হল নৈতিক, চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক ক্রমবিকাশ। মানবজাতিকে নৈতিক আহ্বান জানিয়ে মহাত্মা গান্ধী শুদ্ধতম শক্তির পথ দেখিয়ে গেছেন। সেই বহমান পথেই মানব জাতির সত্যিকারের মুক্তি হতে পারে। অসাম্প্রদায়িক মনোমানসিকতা অকৃত্রিম মানবপ্রেম মহাত্মা গান্ধীর চরিত্রভূষণ ছিল। তার পরও এই মহা মানুষটিকে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের অপরাধে আফ্রিকা ও ভারত মিলিয়ে মোট ১৩ বার কারাবরণ করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় সাজা হয়েছিল ১৯২২ সালে। তৎকালীন একটি পত্রিকায় ব্রিটিশবিরোধী জ্বালাময়ী একটি প্রবন্ধ লেখার জন্য ৬ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় মহান মানুষটিকে। তিনি বিশ্বাস ও আস্থায় ছিলেন অবিচল। ছিলেন প্রচণ্ড আধ্যাত্মিক শক্তিধর একজন মানুষ। তার জন্মদিনকে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
মহাত্মাগান্ধী জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মহাত্মা হননি। এ জন্য অবিরাম সাধনা করতে হয়েছে। নির্মোহ সেই সাধনায় ছিল বীরত্ব। অগ্রজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান্ধীজীর সব কাজ সমর্থন করেননি, তবে তিনিই তাকে মহাত্মা উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। মোহনদাস করমচাঁদ হয়ে উঠলেন মহাত্মাগান্ধী। করুণাপূর্ণ হৃদয়ের মানুষ হিসেবে তিনি বহু ঝঞ্ঝাট স্বীকার করেছিলেন। তার জীবন ছিল সময়ের বাস্তবতায় বিঘ্নপূর্ণ। এমনিতে মনে হতে পারে যে, যার এমন উচ্চ অবস্থা, তার জীবন নিশ্চয়ই ছিল নিশ্চিন্ত, সহজ। কিন্তু তা একেবারেই নয়, সে জীবন ছিল রীতিমতো কঠিন। মহাত্মা গান্ধী নাকি বলেছিলেন, ‘শুধু একজন মহাত্মাই পারে আরেক মহাত্মার উদ্বেগ-আশঙ্কা অনুভব করতে। মহাত্মা গান্ধী শুধু ভারতবর্ষেরই মহাত্মা নন, তিনি সমগ্র পৃথিবীর মহাত্মা হিসেবে সম্মানিত। গান্ধীজীর জীবনে অনেক বিস্ময়কর দৃষ্টান্তের মধ্যে একটি হচ্ছে- সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় উত্তর-প্রদেশের বালিয়া নামক একটি গ্রামে ব্রিটিশ পুলিশ ব্যাপক ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়েছিল। নারীদের সঙ্গে অসদ্ব্যাবহার করেছিল। কেউ প্রতিবাদ করেনি। গান্ধীজী সংবাদটি পেয়ে অনুসন্ধানকারী দল পাঠিয়েছিলেন। তাদের প্রশ্নের উত্তরে গ্রামবাসী বলেছিলেন ‘গান্ধীজী আমাদের অহিংসনীতি শিখিয়েছেন। তাই আমরা চুপ ছিলাম।’ অনুসন্ধানকারী দল ফিরে এসে গান্ধীজীকে বিষয়টি জানালে তিনি (গান্ধীজী) খুব লজ্জিত হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে তিনি সশরীরে ওই গ্রামে গিয়ে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের মা-বোনের মর্যাদা রক্ষা করতে পারলে না, অহিংসার নামে তোমরা ভীরুর মতো থেকেছ। কেন প্রতিবাদ করলে না, আমি তোমাদের এমন অহিংস হতে বলিনি। আমি সাহসী অহিংসা প্রচার করে থাকি। ভীরু-কাপুরুষের নয়।’ জীবনে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে মন্দের প্রতিবাদ করতেই হবে।’ তিনি শান্তির সপক্ষে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে আহ্বান করতেন। এ হচ্ছে গান্ধীজীর শান্তিবাদ। গুজরাটের ভবনগরের সামাল দাস নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ডিগ্রি নিয়ে ১৮৮৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ব্যারিস্টারি পড়তে যান বিলেতে। ২২ বছরে ব্যারিস্টারি পাস করেন। বিলেতে যাওয়ার সময় তার স্নেহময়ী মা তাকে শপথ করিয়েছিলেন মাছ, মাংস না খাওয়া, মাদকজাত দ্রব্য স্পর্শ না করার জন্য। তিনি সেই মায়ের আদেশ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পালন করেছিলেন। নিরামিষভোজি ব্রহ্মাচার্য পালন করে জগৎময় আলো ছড়িয়েছিলেন। ব্রিটিশ-ভারতীয় আইনজীবী হিসেবে প্রথমে তার অহিংস নীতি আদর্শ প্রয়োগ করেন দক্ষিণ আফ্রিকায় নিপীড়িত ভারতীয় সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। পরবর্তী সময়ে ভারতে ফিরে এসে দুস্থ কৃষক মুটে মজুরদের নিয়ে বৈষম্যমূলক কর আদায় ব্যবস্থা, বর্ণ-বৈষম্য ও কর্মবৈষম্যের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন গড়ে তোলেন। ভারতবাসীর দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারী স্বাধীনতা বিভিন্ন ধর্মবর্ণ-জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক সাম্যপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে জোরদার করেন। এ সবই করেছিলেন স্বরাজ অর্থাৎ ভারতকে বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে। ১৯৩০ সালে গান্ধীজী লবণ করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডান্ডি লবণ কুচকাওয়াজে নেতৃত্ব দেন। যেটা ১৯৪২ সালের ইংরেজ শাসকদের প্রত্যক্ষ ভারত ছাড় আন্দোলনের সূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। গান্ধীজী ব্রিটিশ রাজের ন্যাক্কারজনক নৃশংস কাজের প্রতিবাদ করেছেন আবার ভারতীয়দের সশস্ত্র প্রতিরোধ পরায়ণ আচরণেরও নিন্দা করেছেন। ব্রিটিশদের ওপর ভারতীয়দের আক্রমণের একটি ঘটনায় মহাত্মা গান্ধী একটি লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে সমবেদনা প্রকাশ করেন। এতে তার দলের ভেতর অসন্তোষ দেখা দেয়। দলের কর্মী নেতাদের উদ্দেশ্যে আবেগঘন মানবীয় বক্তৃতায় সবার অসন্তোষ দূরীভূত হয়। গান্ধীজী তার জীবনকে সত্যানুসন্ধানে উৎসর্গ করেছেন। অহিংস মতবাদে তিনি নিজে ছিলেন নির্ভীক সবাইকে নির্ভীক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অণুপ্রাণিত করেছেন এটাই তার আদর্শ মানবতা। তিনি নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করেন, তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পরম সত্য আবিষ্কার করেন। তার আত্মজীবনী গ্রন্থের নাম- দি স্টোরি অফ মাই এক্সপেরিমেন্টস উইল ট্রুথ।’ গান্ধীজী প্রথমে ঈশ্বরকে সত্য বলে মানতেন; কিন্তু পরবর্তী সময়ে সাধনা করতে গিয়ে ‘সত্যই হচ্ছে ঈশ্বর,- এই ভাবনাকে প্রচার করেছেন। এটা তার ঈশ্বর বিশ্বাসের দর্শন। তিনি হিন্দু ধর্ম বেদান্তের দর্শন অনুরসণ করলেও সব ধর্মের মূলে রয়েছে সত্য ও প্রেম করুণা ও অহিংসা এটা বিশ্বাস করতেন। গান্ধীজী বলতেন, যার জীবনে নৈতিকতা নেই তার কোনো ধর্মও নেই, তিনি ধার্মিকও নন। অতি সাদামাটা জীবনধারী মানুষ ছিলেন। ভারতীয় ঐতিহ্য চরকা তৈরি কাপড়। নিজ হাতে চড়কা দিয়ে কাপড় বুনিয়ে পোশাক বানাতেন, সেই পোশাকই তিনি পড়তেন। এটা ছিল তার প্রকৃত দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ কূটচাল প্রসূত দাঙা সংগঠিত হয়। হিন্দু-মুসলিম সে দাঙায় বহুলোক প্রাণ হারায়। দাঙার আগুন ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালীতে-এর ভয়াবহতার কথা জেনে গান্ধীজী ছুটে আসেন এখানে। তিনি যে পথে গেছেন সে পথেই ময়লা-আবর্জনা ফেলে রেখেছিল দুষ্টরা, গান্ধীজী নিজ হাতে তা পরিষ্কার করেন। সকল মানুষের উদ্দেশ্যে মানবতার কথা বলেন, মনুষত্ব বোধের কথা শুনান। তার আবেগময়ী ভালোবাসার কথা শুনে মানুষের মধ্যে বিকশিত হয় মূল্যবোধের এক নবতর উপলব্ধি। তার মানবীয় প্রজ্ঞায় দাঙা বন্ধ হয়। ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট ও ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান-ভারত নামে দ্বিজাতি তত্ত্বের আলোকে ভারত ভেঙে দুটি দেশের অভ্যুদয় ঘটে। ব্রিটিশ রাজদের কাছ থেকে রক্তপাতহীন স্বাধীনতা অর্জিত হয় মহাত্মাগান্ধীর এই ভেদ-নীতি পছন্দ হয় না। তারপরও তাকে স্বাধীন ভারতের জাতির পিতা হিসেবে গ্রহণ করে ভারতবাসী। স্বাধীনতা লাভের ৬ মাসের মধ্যে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তাকে হত্যা করে উগ্র ধর্মান্ধ এক যুবক। তার মৃত্যুতে যেন সাড়া পৃথিবীর আলোই নিভে গিয়েছিল সে সময়। তিনি এ পৃথিবীর একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ছিলেন। ছিলেন অসামান্য এক কর্মকুশলি।